ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬,  ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথকে শীর্ষ জেনারেলদের সতর্কবার্তা রাজধানীতে ডিএমপির অভিযান: ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৪১৬, গোলাবারুদ ও মাদক উদ্ধার নতুন পে-স্কেল: মন্ত্রিসভার বৈঠকে উঠছে খসড়া, বৃহস্পতিবারই প্রজ্ঞাপন জারির সম্ভাবনা ট্রাম্পের দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রশংসায় বিশেষ দূত সার্জিও গর লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলার পরই জর্ডানে ২ আমেরিকান ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আমেরিকান জনমতে রেকর্ড পতনে ট্রাম্প, ইসরায়েলেও তোপের মুখে নেতানিয়াহু মাগুরায় শিশু আছিয়া হত্যা ও ধর্ষণ মামলায় হাইকোর্টের রায় আজ কটিয়াদীতে সিএনজি ও কাভার্ড ভ্যানের সংঘর্ষে শিশুসহ নিহত ৩, আহত ৪ ডেঙ্গুতে এক দিনে আক্রান্ত ১০৯৭ ও ৩ জনের মৃত্যু মন্ট্রিলের বিপক্ষে মেসির ৪ গোল, মুগ্ধ সতীর্থ কাসেমিরো

মধ্যপ্রাচ্যের তেল খাতে তীব্র আঘাত

বিলিয়ন ডলারের বিশাল ঝুঁকিতে মার্কিন কোম্পানিগুলো


  • আপলোড সময় : রবিবার ৩০ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ৫:০৫ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যের তেল খাতে আঘাত, বিলিয়ন ডলারের ঝুঁকিতে মার্কিন বিনিয়োগ

ইরানকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পারস্য উপসাগরীয় সামগ্রিক অঞ্চলের জ্বালানি খাতের ওপর অত্যন্ত গভীরভাবে পড়তে শুরু করেছে। এই সীমান্ত ও সামরিক সংঘাতের দীর্ঘ ছায়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অপরিশোধিত তেলের বাজারমূল্য একলাফে অনেকটাই বেড়ে গেছে। এর সরাসরি ফলে বৃহৎ মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো পূর্বের তুলনায় কম পরিমাণ তেল বিক্রি করেও চড়া দামে বিশ্বজুড়ে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য সরবরাহ করে সাময়িকভাবে বিপুল অঙ্কের রেকর্ড চড়া মুনাফা নিজেদের পকেটে পুরতে সক্ষম হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর ওপর অব্যাহত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এই অঞ্চলে মার্কিন জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদী বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ এখন চরম ও নজিরবিহীন আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছে।


যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আশঙ্কাজনকভাবে এবং উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সংঘাতের পূর্বে যেখানে বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল গড়ে ৭২ ডলারে বিক্রি হতো, তা বর্তমান সংকটে একলাফে বেড়ে গিয়ে প্রায় ৮৮ ডলারে ঠেকেছে। সমগ্র বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের এক সুবিশাল অংশ যে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো, সেই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্বখ্যাত হরমুজ প্রণালি সাম্প্রতিক তীব্র সামরিক অস্থিতিশীলতার কারণে বাণিজ্যিকভাবে প্রায় পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে।


সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান ও ওমানের মধ্যে সাময়িকভাবে সমুদ্রযান চলাচলের কিছু দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও, সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি নিরাপদে খুলে দেওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা মিলছে না। ইরান কড়া বার্তায় সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের আরোপিত শর্তসমূহ পুরোপুরি না মানা পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানো হবে না। এর ফলে আন্তর্জাতিক খোলা বাজারে জ্বালানির দাম অনবরত চড়া থাকছে, যা তেল কোম্পানিগুলোর তৎক্ষণাৎ আর্থিক আয় বা রাজস্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিলেও সার্বিক খাতের দীর্ঘমেয়াদী স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে একদম থমকে দিচ্ছে।


তবে বিশ্বের সব মার্কিন তেল প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক ঝুঁকি ও আয়ের হিসাব কিন্তু একদম একই রকম নয়। শেভরনের মতো বিশ্বখ্যাত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যপ্রাচ্যের অঞ্চলের ওপর বাণিজ্যিক নির্ভরতা তুলনামূলক কম হওয়ায় তারা সংকটকালীন এই সময়ে রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা পকেটে পুড়তে পেরেছে। কিন্তু এক্সনমোবিল ও কনোকোফিলিপসের মতো মার্কিন বৃহৎ শক্তি জায়ান্টরা পড়েছে চরম ও তীব্র বিপাকে।


মধ্যপ্রাচ্যের সমৃদ্ধ কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে এসব শীর্ষস্থানীয় মার্কিন তেল কোম্পানির শত শত কোটি ডলারের বড় বড় যৌথ উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় অস্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপট থেকে বহুজাতিক এসব মার্কিন শক্তি কোম্পানিগুলোর নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ এবং তেল উত্তোলন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের চড়া বাজারমূল্য প্রাথমিক এই বড় আর্থিক ক্ষতি কিছুটা ঢেকে দিতে সাময়িক সাহায্য করলেও, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে যে অসামান্য বিলম্ব এবং অবকাঠামোগত ক্ষতি সাধিত হচ্ছে, তা কোম্পানি পরিচালনা পরিষদের আগামী দিনের বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


চলমান সংঘাতের তাণ্ডবে পারস্য উপসাগরীয় উপকূলীয় দেশগুলোর কেবল সামরিক স্থাপনাই নয়, বরং সাধারণ নাগরিক জীবন ও জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন ও আন্তর্জাতিক শক্তির অন্যতম কেন্দ্র সৌদি আরবের বিভিন্ন আধুনিক শোধনাগার, বৃহৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল গ্যাস কমপ্লেক্সগুলোতে একের পর এক সমন্বিত হামলা চালানো হয়েছে।


বিশ্বখ্যাত কাতার-এনার্জির সাথে যৌথ অংশীদারিত্বে পরিচালিত মার্কিন তেল জায়ান্ট এক্সনমোবিলের গুরুত্বপূর্ণ এলএনজি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রগুলো সরাসরি হামলার শিকার হওয়ায় তাদের সার্বিক উৎপাদন দীর্ঘদিন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল। জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব ক্ষতিগ্রস্ত আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ ও নতুন করে সারিয়ে তুলতে আগামীতে বহু বছর সময় লেগে যাবে এবং একই সাথে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত অর্থ ও মূলধন খরচ করতে হবে।


মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে স্থানীয় সৌদি আরামকো কিংবা আদনকের মতো প্রতাপশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের একক প্রাধান্য দৃশ্যমান থাকলেও, শীর্ষ মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো সেখানে তাদের প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও কার্যক্রম পরিচালনার দিক থেকে এক অদম্য ও শক্তিশালী ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল। এমনকি তেল উত্তোলনে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রধান প্রধান মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপুল আয়ও এখন মধ্যপ্রাচ্যের এই অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতায় চরম অনিশ্চয়তায় আটকে পড়েছে।


মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সার্বিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখার জন্য বিখ্যাত হরমুজ প্রণালি দ্রুত উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে একাধিক কড়া বার্তা ও হুঁশিয়ারি প্রদান করলেও, বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে দৃশ্যপট একেবারেই ভিন্ন। বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তেলের বাড়তি দাম কোম্পানিগুলোকে সাময়িক আর্থিক স্বস্তি দিলেও, পারস্য উপসাগরের এই দীর্ঘায়িত অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মার্কিন শক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য শেষ পর্যন্ত এক বিশাল ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক রূপ নিয়েছে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর