ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬,  ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথকে শীর্ষ জেনারেলদের সতর্কবার্তা রাজধানীতে ডিএমপির অভিযান: ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৪১৬, গোলাবারুদ ও মাদক উদ্ধার নতুন পে-স্কেল: মন্ত্রিসভার বৈঠকে উঠছে খসড়া, বৃহস্পতিবারই প্রজ্ঞাপন জারির সম্ভাবনা ট্রাম্পের দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রশংসায় বিশেষ দূত সার্জিও গর লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলার পরই জর্ডানে ২ আমেরিকান ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আমেরিকান জনমতে রেকর্ড পতনে ট্রাম্প, ইসরায়েলেও তোপের মুখে নেতানিয়াহু মাগুরায় শিশু আছিয়া হত্যা ও ধর্ষণ মামলায় হাইকোর্টের রায় আজ কটিয়াদীতে সিএনজি ও কাভার্ড ভ্যানের সংঘর্ষে শিশুসহ নিহত ৩, আহত ৪ ডেঙ্গুতে এক দিনে আক্রান্ত ১০৯৭ ও ৩ জনের মৃত্যু মন্ট্রিলের বিপক্ষে মেসির ৪ গোল, মুগ্ধ সতীর্থ কাসেমিরো

দীর্ঘায়িত ইরান যুদ্ধ ও বিশ্ব অর্থনীতি

আমেরিকান জনমতে রেকর্ড পতনে ট্রাম্প, ইসরায়েলেও তোপের মুখে নেতানিয়াহু


  • আপলোড সময় : সোমবার ৩১ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ৮:৫৩ এএম

মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ তিন দেশের শীর্ষ নেতাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে এক অভূতপূর্ব সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তেহরানজুড়ে পরিচালিত বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাদের কাক্সিক্ষত জয়ের আশা করেছিলেন। তবে ছয় মাসের মাথায় এসে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর কোনোটিই অর্জিত হয়নি।

 

হোয়াইট হাউস থেকে ইরানের পারমাণবিক ক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করার দাবি করা হলেও বাস্তবতা বলছে উল্টো কথা। যুদ্ধের মারাত্মক প্রভাব, আকাশচুম্বী জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে আজ ওয়াশিংটন থেকে জেরুজালেম এবং তেহরান—সব জায়গাতেই শীর্ষ নেতৃত্ব কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরা তাদের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে যুদ্ধের এই দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিণতির বিশদ চিত্র তুলে ধরেছে।

 

আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই যুদ্ধের প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক রূপ নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনের সময় বাইডেন সরকারের মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির তীব্র সমালোচনা করে ক্ষমতায় এসেছিলেন। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে আমেরিকার সাধারণ মানুষের পকেটে। ট্রাম্প বারবার আশ্বাস দিয়ে আসছিলেন যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের সঙ্গে খুব দ্রুত চুক্তি বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। তবে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির যে বেহাল দশা তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে এই মৌখিক প্রতিশ্রুতি কোনো কাজে আসছে না।

 

একাধিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা এবং জনপ্রিয়তা এখন রেকর্ড পরিমাণ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। আমেরিকার মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শিবলী তেলহামি আন্তর্জাতিক মাধ্যমকে জানান, যুদ্ধের কারণে জীবনযাত্রার যে অনিয়ন্ত্রিত ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, তা এখন সাধারণ আমেরিকানদের প্রধান চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধ্যাপক তেলহামির মতে, ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি শুরুতে থাকা তরুণ রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যেও তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তারা মনে করছেন, ইসরায়েল তার নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রকে চক্রান্ত করে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধে টেনে এনেছে। আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা ও জনমত জরিপকারী সংস্থা ইপসোসের এক সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র এক-তৃতীয়াংশ আমেরিকান নাগরিক এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন।

 

রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানো এবং ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে আমেরিকান শর্তে বাধ্য করার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অতি সম্প্রতি ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ নামে নতুন এবং অত্যন্ত কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র বাহিনীর ঐতিহাসিক অভিযানের নামানুসারে এই কৌশল অবলম্বন করা হলেও বাস্তবে তা ইরানি প্রশাসনকে ভেঙে ফেলতে পারেনি। আমেরিকান সাবেক শীর্ষ কূটনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যারন ডেভিড মিলার ব্যাখ্যা করেছেন যে, নজিরবিহীন অর্থনৈতিক চাপ ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করেও তেহরানের বর্তমান সরকার শক্তভাবে টিকে রয়েছে।

 

মিলার আল-জাজিরাকে জানান, ইরানের কাছে এখনো উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে এবং তারা ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে হরমুজ প্রণালি কার্যক্ষমতাহীন ও অবরুদ্ধ করে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া হামাস কিংবা হিজবুল্লাহর মতো তাদের আঞ্চলিক সহযোগী দলগুলোর সাময়িক ক্ষতি হলেও তারা এখনও সক্রিয়। ওয়াশিংটন ইরানের ভেতরে যে ধরনের অভ্যন্তরীণ গণবিক্ষোভ বা বিভাজনের প্রত্যাশা করেছিল, তার কিছুই ঘটেনি। ফলে, প্রতিরোধ গড়ে তোলার দিক থেকে ইরান এখনও বড় ধরণের সাফল্য দেখাচ্ছে।

 

অন্যদিকে, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য অত্যন্ত ভীতিকর হয়ে উঠেছে। লন্ডনের কিংস কলেজের সিনিয়র টিচিং ফেলো এবং ইসরায়েলি রাজনৈতিক-নিরাপত্তা বিশ্লেষক আহরন ব্রেগম্যান মন্তব্য করেছেন যে, গাজা ও লেবাননে ব্যর্থতার পর ইরানেও নেতানিয়াহু পুরোপুরি ব্যর্থ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন। অনেক ইসরায়েলি মনে করছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে নিরস্ত করার মূল লক্ষ্যের দিকে নজর না দিয়ে নেতানিয়াহু কেবল তেহরানের সরকার পতনের মোহে ট্রাম্পকে এই অভিযানে যুক্ত করেছিলেন। এই সামরিক ভুল সিদ্ধান্তের ফলে ইরান এখন পারমাণবিক বোমা তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, যা ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তাকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ফেলেছে।

 

ইসরায়েলের প্রাক্তন সরকারি উপদেষ্টা দানিয়েল লেভি মনে করেন, নেতানিয়াহু আশা করেছিলেন ইরান যুদ্ধ তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় এক নতুন চমক আনবে। কিন্তু যুদ্ধ পরিকল্পনা অনুযায়ী না এগোনোয় তাঁর রাজনৈতিক কৌশল ভেস্তে গেছে। আন্তর্জাতিক সমঝোতার টেবিলে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে জুনে অনুষ্ঠিত একক চুক্তিপ্রক্রিয়া নেতানিয়াহুর ঘরোয়া রাজনৈতিক বিরোধীদের হাতকে আরও শক্তিশালী করেছে। নেতানিয়াহু এখন আমেরিকার নতুন 'অর্থনৈতিক ডি-ডে' নিষেধাজ্ঞার ওপর নির্ভর করছেন এই আশায় যে, আমেরিকা হয়তো হতাশ হয়ে পড়ে যুদ্ধকে আরও ভয়াবহ রূপ দেবে।

 

অবশ্য ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতিও পুরোপুরি সহনীয় নয়। মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে দেশটির অর্থনীতি প্রচণ্ড চাপে রয়েছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম চার মাসেই তাদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ১৪৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি এবং বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৬৬ শতাংশ ছুঁয়েছে। তা সত্ত্বেও ইরান বিষয়ক শিক্ষাবিদ ও লেখক শারভিন মালেকজাদেহের মতে, নিজেদের চরম সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় সম্মান রক্ষার চিরন্তন মানসিকতার কারণে কঠোর অর্থনৈতিক সংকট সত্ত্বেও জনগণ সরকারের পাশেই অবস্থান নিচ্ছে। যদিও ইরানের নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে মধ্যপন্থী ও কট্টরপন্থীদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তবুও টিকে থাকার লড়াইয়ে এই মুহূর্তে কোনো পক্ষই নতিস্বীকার করতে রাজি নয়।

(আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরা-এর সূত্র ধরে সংগৃহীত)



এ সম্পর্কিত আরো খবর