মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে সৌদি আরব ও তুরস্ক ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির। একই সঙ্গে এই জোটে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ঢাকা আপাতত কোনো ঝুঁকি দেখছে না বলেও জানিয়েছেন তিনি। রোববার (৩০ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১।
মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, বিষয়টি নিয়ে এখনই নেতিবাচক কোনো আশঙ্কা দেখছে না বাংলাদেশ। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, কোনো কিছু ঘটার আগেই তার নেতিবাচক পরিণতি নিয়ে চিন্তা করলে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়ার বিষয়টি নির্ভর করবে চুক্তিতে থাকা সদস্যদেশগুলোর অভিপ্রায়ের ওপর। তারা বাংলাদেশকে এই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করলে ঢাকা বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান আরও জানিয়েছিলেন, মক্কা চুক্তি বিশ্বের মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার একটি ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনটি দেশের মধ্যে এই চুক্তি হয়েছে এবং বাংলাদেশ বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। তবে বাংলাদেশ এতে যোগ দেবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্তের পর্যায় আসেনি। কারণ, বিষয়টি মূলত চুক্তির সদস্যদেশগুলোর অভিপ্রায়ের ওপর নির্ভর করছে।
পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে এই প্রতিরক্ষা চুক্তি গত ৭ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়েছে। চুক্তির মূল বিষয় অনুযায়ী, জোটের কোনো একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে অন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ওপরও হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর ফলে সদস্যদেশগুলো পারস্পরিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে সহযোগিতার কাঠামোর মধ্যে থাকবে।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এর আগে বলেছিলেন, মক্কা চুক্তির তিন সদস্যদেশ বাংলাদেশকে এতে যুক্ত করার বিষয়ে অভিপ্রায় প্রকাশ করলে ঢাকা বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছিলেন, চুক্তির পরিধি ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হলে সেটিকে বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার একটি ব্যবস্থা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
খলিলুর রহমান আরও বলেন, এটি মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয় হওয়ায় এ নিয়ে অন্যদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এদিকে রোববার ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্কের বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ের কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। এই সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে বিভিন্ন পর্যায়ে সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ও চীন কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সংলাপ শুরু করতে যাচ্ছে।
তিনি জানান, দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সংলাপ আয়োজনের বিষয়ে প্রস্তুতি চলছে। তবে এখনো এর নির্দিষ্ট দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হয়নি। আলোচনার মাধ্যমে সুবিধাজনক সময়ে সংলাপের তারিখ নির্ধারণ করা হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সময়ের সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। পারস্পরিক স্বার্থ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়গুলো এই সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করছে।
মক্কা প্রতিরক্ষা জোট প্রসঙ্গে ঢাকার অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কোনো আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক উদ্যোগে সম্পৃক্ত হওয়ার আগে এর সম্ভাব্য প্রভাব, সুযোগ ও ঝুঁকির বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে। ফলে মক্কা জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার বিষয়টিও যথাযথভাবে পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সৌদি আরব ও তুরস্কের ইতিবাচক মনোভাবকে বাংলাদেশ কীভাবে দেখছে—এমন প্রশ্নে হুমায়ুন কবির বলেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। তবে জোটে যোগদানের বিষয়টি কেবল আগ্রহ বা ইতিবাচক মনোভাবের ওপর নির্ভর করবে না; এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিষয় বিবেচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বর্তমানে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের সদস্য পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক। তিন দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে জোটের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে সদস্যদেশগুলোর আগ্রহ থাকলে ঢাকা তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে—এমন অবস্থানই তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা।
তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত বা চূড়ান্ত প্রস্তাবের কথা জানানো হয়নি। ফলে সম্ভাব্য সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা থাকলেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ঘোষণা আসেনি।
অন্যদিকে চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সংলাপ শুরুর উদ্যোগকে বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির কৌশলগত সম্পর্কের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছে ঢাকা। দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ ও সহযোগিতা আরও জোরদার করার ক্ষেত্রে এই সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে সংলাপের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হওয়ার পরই এ বিষয়ে বিস্তারিত কর্মসূচি জানা যাবে।
সব মিলিয়ে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি এবং চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সংলাপ—দুটি বিষয়ই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জায়গা তৈরি করেছে। একদিকে মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন কাঠামো, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করার উদ্যোগ—দুই ক্ষেত্রেই জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে এগোতে চায় ঢাকা।