ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই: মীর শাহে আলম দুপুরের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ: কমবে লোডশেডিং এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২ কমলা হ্যারিসের বাড়িতে অনধিকার প্রবেশের চেষ্টা, পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার

নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা

নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সময় : ৯:২২ এএম

নেপালের ভোটেকোশি নদীতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া মারাত্মক ও আকস্মিক বন্যার কারণে দেশটির সামগ্রিক জ্বালানি অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। গত ২৬ আগস্ট পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির ফলে সৃষ্টি হওয়া এই বিধ্বংসী ও আকস্মিক বন্যায় নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানির পাশাপাশি অবকাঠামোগত কাঠামোর অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে। শতাধিক নিরীহ মানুষ প্রাণ হারানোর পাশাপাশি নদীর অববাহিকায় নির্মিত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জলবিদ্যুৎকেন্দ্র বা হাইড্রোপাওয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের সরাসরি প্রভাবে নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা শতভাগ ও সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।

 

হিমালয় কন্যা হিসেবে পরিচিত পর্বতঘেরা রাষ্ট্র নেপালের ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক নদ-নদীর প্রবাহের কারণে বর্ষাকালে নদীগুলোতে পানির প্রবাহ ও চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। নদীর প্রবাহ বৃদ্ধির সাথে সাথে দেশটির জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ও মাত্রা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। বছরের এই সুনির্দিষ্ট সময়ে নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পর নেপালের কাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত থাকে। অতিরিক্ত এই উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ তারা প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে রপ্তানি করে নিজেদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করে আসছিল।

 

দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সম্প্রতি ভারতীয় গ্রিড ও সঞ্চালন লাইন সফলভাবে ব্যবহার করে নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেছিল। কিন্তু নেপালের পাহাড়ি নদীগুলোতে সাম্প্রতিক আকস্মিক ও বিধ্বংসী বন্যার তাণ্ডবে সেই সম্ভাবনাময় বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির ও বন্ধ হয়ে পড়েছে।

 

সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্টের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ভোটেকোশি নদীতে আচমকা এবং প্রচণ্ড বেগে বন্যা আসার পর নদীর তীরবর্তী অঞ্চল ও আশেপাশের একাধিক প্রধান হাইড্রোপাওয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। বন্যার পানির প্রবল তোড়ে ও কাদা-বালুর স্তূপে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও টারবাইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সার্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রমে ভয়াবহ ধস নেমে এসেছে।

 

সাধারণত আবহাওয়া শুষ্ক থাকার মৌসুমেও নেপাল তাদের নিজেদের উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ থেকে গড়ে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে আসছিল। কিন্তু বর্তমান দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে এবং একাধিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র অচল হয়ে যাওয়ার কারণে তাদের মোট রপ্তানি ক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে মাত্র ৬৫০ মেগাওয়াটে এসে পৌঁছেছে। এই অভাবনীয় ঘাটতি তাদের আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাজারের ওপর বেশ বড় রকমের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

 

জলবায়ু ও পরিবেশগত কারণে নেপালে শীতকালে অভ্যন্তরীণ বিদ্যুতের চাহিদা দ্বিগুণ বা বহুগুণ বেড়ে যায়। অতিরিক্ত এই চাহিদার প্রেক্ষাপটে একসময় শীতের দিনগুলোতে দেশটির সরকারকে বাধ্য হয়ে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে মোটা অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রায় বিদ্যুৎ আমদানি করতে হতো। তবে বিগত কয়েক বছরে নতুন নতুন আধুনিক হাইড্রোপাওয়ার প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশটি নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে সক্ষম হয়। শুধু চাহিদাই মেটায়নি, বরং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ প্রতিবেশী দেশে বিক্রি করে একটি সম্ভাবনাময় ও সমৃদ্ধ আঞ্চলিক বিদ্যুৎ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়ে তুলছিল।

 

আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও রপ্তানির জন্য সুনির্দিষ্ট দুটি প্রধান কেন্দ্রকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে একটি হলো ২২ দশমিক ১ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন চিলমি হাইড্রোপাওয়ার প্রজেক্ট এবং অপরটি হলো ২৪ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন ত্রিশূলি হাইড্রোপাওয়ার প্রজেক্ট। দুর্ভাগ্যবশত, গত সপ্তাহের ভয়াবহ বন্যায় এই দুটি প্রধান বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গত সপ্তাহ থেকেই প্রতিষ্ঠান দুটি তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম শতভাগ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।

 

উল্লেখযোগ্য যে, এই প্রতিষ্ঠান দুটি সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি ও বাণিজ্যিক নিয়ম মেনে মার্কিন ডলারের বিনিময়ে ভারতের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও সঞ্চালন অবকাঠামো ব্যবহার করে বাংলাদেশে তাদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ সফলভাবে রপ্তানি করা শুরু করেছিল। কিন্তু হঠাৎ করে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়া এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের উৎপাদন থমকে যাওয়ায় দুই দেশের বিদ্যুৎ বাণিজ্যে সাময়িক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

 

বিদ্যমান এই অচল অবস্থা ও চলমান সংকট নিরসনে নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠ পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার দায়িত্বে থাকা মূল দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রই সাম্প্রতিক বন্যায় গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও অচল হয়ে পড়েছে। এই অপ্রত্যাশিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে আমরা ভারতকে বিকল্প হিসেবে নেপালের অন্য কোনো কার্যকর ও সচল প্রজেক্ট থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ পাঠানোর সুনির্দিষ্ট সুযোগ ও অনুমতি দেওয়ার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছি।”

 

বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সংস্কার কাজ ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি বিকল্প পথ ও অন্যান্য সচল কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সঞ্চালন পুনরায় শুরু করার জন্য নেপাল ও ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনা ও সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো দ্রুত পুনর্বাসিত না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় চালু হওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট


এ সম্পর্কিত আরো খবর