আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই মাসের মধ্যবর্তী মাত্র নয় মাসে আফ্রিকার অন্তত ছয়টি দেশে ‘যৌনাঙ্গ চুরি’ বা অঙ্গহানির অদ্ভুত ও ভিত্তিহীন গুজব কেন্দ্র করে সংঘটিত গণপিটুনিতে ৮০ জনেরও বেশি মানুষের করুণ মৃত্যু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা বিবিসি-র গ্লোবাল ডিসইনফরমেশন ইউনিটের অনুসন্ধানে সম্প্রতি আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের পুলিশ প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে এই ভয়াবহ চিত্র ভেসে উঠেছে। হাত দিয়ে পিঠে বা শরীরে সামান্য স্পর্শ করলেই পুরুষের যৌনাঙ্গ অদৃশ্য বা সংকুচিত হয়ে যায়—এমন মধ্যযুগীয় অন্ধবিশ্বাস ও কাল্পনিক গুজব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তীব্র প্রসারের কারণে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এই প্রাণঘাতী সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
তানজানিয়ার মেকানিক বনিফাস এমগালা তাঁর ওপর ঘটে যাওয়া এমনই এক নৃশংস নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে জানান, চলতি বছরের এপ্রিলে এক মক্কেলের সঙ্গে গাড়ি বিক্রির বিষয়ে কথা বলতে এবং দুপুরের খাবার খেতে তুন্দুমা এলাকায় যান তিনি। রেস্তোরাঁয় বসতেই একদল উন্মত্ত জনতা তাঁকে ও তাঁর বন্ধুকে ঘিরে ধরে অনর্থক চিৎকার করে বলতে থাকে যে তাঁরা নাকি স্থানীয় এক ব্যক্তির যৌনাঙ্গ চুরি করেছেন। ভিড়ের তোপে পালানোর সুযোগ না পেয়ে প্রচণ্ড গণপিটুনির শিকার হন তাঁরা। মারধরের একপর্যায়ে এমগালা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। দুই দিন পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর জ্ঞান ফিরলে তিনি জানতে পারেন, গণপিটুনিতে তাঁর সঙ্গে থাকা বন্ধুটি মৃত্যুবরণ করেছেন। এমগালার নিজেরও একটি দাঁত ভেঙে গেছে, থুতনিতে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে এবং তিনি শারীরিকভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টিকটক ও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া কনটেন্ট এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যের কারণে গুজব ও আতঙ্ক বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। লাখ লাখ ভিউ হওয়া ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, উত্তেজিত জনতা নির্দোষ পথচারীকে অভিযুক্ত করে রাস্তায় টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং তথাকথিত ‘চুরি যাওয়া অঙ্গ’ ফেরত দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। তানজানিয়ার তুন্দুমার স্থানীয় ব্যবসায়ী ও চিত্রগ্রাহক মাইকেল সিলাভওয়ে জানান, অনলাইনে এসব ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর লোকজনের মনে চরম ভীতি তৈরি হয়। ফলে সন্দেহভাজন কাউকে দেখা মাত্রই গণপিটুনি দেওয়া এমনকি আগুনে পুড়িয়ে মারার মতো বর্বরোচিত ঘটনাও ঘটেছে।
নৃতত্ত্ববিদ ও গবেষক জুলিয়েন বনহোম তাঁর গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘দ্য সেক্স থিভস: দ্য অ্যানথ্রোপোলজি অব আ রিউমার’-এ উল্লেখ করেছেন যে, আফ্রিকায় জাদুটোনা ও কুসংস্কারের বিশ্বাস দীর্ঘদিনের পুরোনো হলেও স্মার্টফোন এবং সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা ভিডিওগুলোর কারণে এ ধরনের গুজব নিমিষেই বিশ্বাসযোগ্য রূপ লাভ করছে এবং জনমনে আতঙ্ক তৈরি করছে। অনেক কনটেন্ট ক্রিয়েটর ভিউ, এনগেজমেন্ট ও অনু অনুসারী বাড়াতে সত্যতা যাচাই ছাড়াই এ ধরনের ভিডিও ছড়ায়। এমনকি অনলাইনে একশ্রেণির অসাধু চক্র এই সুযোগে ‘যৌনাঙ্গ চুরির হাত থেকে সুরক্ষার’ দাবি করে তথাকথিত তাবিজ-কবচও বিক্রি করা শুরু করে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আফ্রিকা মহাদেশে এই ধরনের আজব গুজবের প্রাদুর্ভাব নতুন নয়। ২০০৮ সালে প্রথম এই গুজবের উৎপত্তি ঘটে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে। পরবর্তীতে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের দিকে তা দ্রুত সীমান্ত পার হয়ে আশপাশের দেশ বুরুন্ডি, জাম্বিয়া, তানজানিয়া, মোজাম্বিক, অ্যাঙ্গোলা, মালাউই ও কেনিয়ায় প্রবেশ করে। চলতি বছরের মার্চ মাসে জাম্বিয়ায় এক নারীকে এই অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করার পর আতঙ্কটি দাবানলের মতো প্রতিবেশী দেশেগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।
আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে এই গুজবে সবচেয়ে বড় রক্তক্ষয়ের সাক্ষী হয়েছে মোজাম্বিক। দেশটির পুলিশ জানায়, মে মাস পর্যন্ত মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যে একজন পুলিশ কর্মকর্তা, স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী ও সরকারি কর্মচারীসহ অন্তত ৫৫ জন নিরপরাধ মানুষ গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন। এমনকি উগ্রপন্থার কারণে অশান্ত ক্যাবো ডেলিগাডো প্রদেশের দুটি প্রধান স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও উত্তেজিত জনতা হামলা চালায়, যার ফলে কিছুদিন চিকিৎসা সেবা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়। পরবর্তীতে মোজাম্বিকের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল চাপো আনুষ্ঠানিকভাবে এসব গুজবের তীব্র নিন্দা জানান এবং ঘোষণা দেন যে, কারও শরীর থেকে এভাবে অঙ্গ গায়েব হওয়ার মতো কোনো বৈজ্ঞানিক বা চিকিৎসাগত প্রমাণ মেলেনি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের ভয়ের একটি বড় অংশের সঙ্গে মানসিক অসুস্থতা বা ‘কোরো সিন্ড্রোম’ জড়িয়ে রয়েছে, যেখানে রোগী নিজে মনে করেন তাঁর অঙ্গ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
একইভাবে কেনিয়ার উপকূলীয় কাউন্টি মোম্বাসা ও কোওয়ালেতে গণপিটুনিতে অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। কেনীয় পুলিশ পরবর্তীতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে মূল গুজব রটনাকারী এক বাবা ও তাঁর ছেলেকে গ্রেফতার করে এক বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছে। অন্যদিকে মালাউইতেও জনতাকে উসকে দিয়ে গণপিটুনির ঘটনায় আটজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বহু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম দাবি করছে যে তারা নীতিমালা লঙ্ঘনকারী ভিডিও সরিয়ে নিচ্ছে, কিন্তু ইতোমধ্যে এই আধুনিক ও ডিজিটালাইজড অন্ধবিশ্বাসের শিকার হয়ে শত শত মানুষের তাজা প্রাণ অকাতরে ঝরে গেছে।
(তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা)