বিশ্ব
রাজনীতিতে কয়েক দশক আগেও ‘গ্রেট ব্রিটেন’ সম্পর্কে একটি অতিপরিচিত প্রবাদ প্রচলিত ছিল—‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য কখনো অস্ত যায় না।’ তবে সময় ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রুশ পররাষ্ট্রনীতিতেও এসেছে দৃশ্যমান রূপান্তর। সম্প্রতি রাশিয়ার সরকারি কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো
ইচ্ছাকৃতভাবে ‘গ্রেট ব্রিটেন’ বা ‘ইউনাইটেড কিংডম’ (যুক্তরাজ্য) নামটি এড়িয়ে গিয়ে কেবল ‘ব্রিটেন’ শব্দটি ব্যবহার করছে। এই ভাষাগত পরিবর্তন
কেবল কূটনৈতিক পরিভাষার রদবদল নয়, বরং ক্রেমলিনের চোখে যুক্তরাজ্যের বর্তমান বৈশ্বিক অবস্থান ও নিম্নমুখী ভাবমূর্তির
এক স্পষ্ট বার্তা।
রাশিয়ার
কূটনৈতিক কার্যক্রমের বার্ষিক ফলাফল পর্যালোচনা সংক্রান্ত এক সংবাদ সম্মেলনে
বিষয়টির ব্যাখ্যা দেন দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে রুশ কূটনীতির মূল নিয়ন্ত্রক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ।
তিনি জানান, কাউকে অসম্মান করা তাঁদের লক্ষ্য নয়। তবে কোনো দেশ নিজেই নিজের নামের আগে ‘মহান’ বা ‘গ্রেট’ বিশেষণ যুক্ত করেছে—এমন একমাত্র উদাহরণ হলো গ্রেট ব্রিটেন। এ প্রসঙ্গে তিনি
কিছুটা শ্লেষের সুরেই উল্লেখ করেন যে, বিশ্বের ইতিহাসে অন্য উদাহরণটি ছিল ‘গ্রেট লিবিয়ান জামাহিরিয়া’, যে দেশটির অস্তিত্ব
আজ আর নেই।
যদিও
ঐতিহাসিকভাবে ‘গ্রেট’ শব্দটি ভৌগোলিক কারণে ব্যবহৃত হতো—ফ্রান্সের ‘ব্রিটানি’ অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করে আলাদা বোঝাতে এটি ব্যবহার করা শুরু হয়। তবে বর্তমান রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই আচরণ থেকে
স্পষ্ট যে, তারা লন্ডনের প্রতি তাদের মনোভাবের এক মৌলিক পরিবর্তন
প্রদর্শন করছে।
ইতিমধ্যে
মস্কো ও লন্ডনের মধ্যকার
কূটনৈতিক সম্পর্কে মারাত্মক ধস নেমেছে। যুক্তরাজ্যে
নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই কেলিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত
হিসেবে মস্কো নতুন কোনো রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেয়নি। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটি রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারের সমান এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের মর্যাদা ‘চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স’ পর্যায়ে নামিয়ে আনারই লক্ষণ। যা উভয় পারমাণবিক
শক্তিধর দেশের সম্পর্ককে ইতিহাস সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। রাশিয়া ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার
কূটনৈতিক সংলাপ এখন প্রায় ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে।
ইতিহাসের
পাতায় রুশ সাম্রাজ্যের সময় থেকেই ব্রিটেন ছিল মস্কোর প্রধান ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। ১৮৫৩-১৮৫৫ সালের ক্রিমিয়ার যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে জোট গঠন কিংবা মধ্য এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ‘দ্য গ্রেট গেম’-এর সূচনা—প্রতিটি
পদক্ষেপে লন্ডন ছিল মূল অনুঘটক। পরবর্তীতে সোভিয়েত আমলে উইনস্টন চার্চিলের ঐতিহাসিক ‘ফুলটন ভাষণ’ শীতল যুদ্ধের সূচনা করেছিল, যা যৌথ সম্পর্কের
টানাপোড়েনকে বহুদূর নিয়ে যায়।
বর্তমানে
চলমান ইউক্রেন যুদ্ধেও কিয়েভকে সামরিক ও কৌশলগত সহায়তা
প্রদানে যুক্তরাজ্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। কিয়েভের সঙ্গে খনিজ সম্পদ চুক্তি স্বাক্ষর থেকে শুরু করে মস্কোর বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর সমন্বয় সাধনে লন্ডন নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই সার্বিক ভূরাজনৈতিক
বৈরিতা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের চরম অবনতির কারণেই রাশিয়ার কাছে তথাকথিত ‘গ্রেট ব্রিটেন’ আজ আর ‘গ্রেট’
হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না।
(তথ্যসূত্র:
আরটি)