দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষক ও নৈশপ্রহরীর চরম সংকটে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলার ১০৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭২টিতেই কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। পাশাপাশি ৮০টি বিদ্যালয়ে নৈশপ্রহরী-কাম-দপ্তরি পদ শূন্য পড়ে রয়েছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ১০৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে নির্ধারিত প্রধান শিক্ষক পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র ৩৭ জন স্থায়ী প্রধান শিক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন। অবশিষ্ট ৭২টি শূন্য পদে সহকারী শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। ২০১৭ সালের পর থেকে নতুন করে এসব পদে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় এই জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একজন প্রধান শিক্ষককে বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক বিভিন্ন কাজ, প্রশাসনিক সভা, শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রক্রিয়া এবং সরকারি হিসাব-নিকাশসহ নানাবিধ কাজে প্রায়শই শিক্ষা অফিসে উপস্থিত থাকতে হয়। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা এসব প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকার কারণে তাদের নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রমে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটছে। এতে সংশ্লিষ্ট ৭২টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পড়াশোনায় অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং একই সঙ্গে প্রশাসনিক কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে চরম স্থবিরতা।
এছাড়া ফুলবাড়ী উপজেলায় বিদ্যালয় পরিদর্শনের জন্য তিনজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। একটি পদ শূন্য থাকায় দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত বিদ্যালয় পরিদর্শনের কাজ সম্পাদন করতে হচ্ছে। ফলে নিয়মিত বিদ্যালয় মনিটরিং ও পাঠদান মূল্যায়ন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোর সার্বিক নিরাপত্তা নিয়েও বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ১০৯টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮০টিতে কোনো নৈশপ্রহরী-কাম-দপ্তরি না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে রাতের বেলা এসব প্রতিষ্ঠান অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সুযোগে বিভিন্ন সময় একাধিক বিদ্যালয় থেকে মূল্যবান ল্যাপটপ, প্রজেক্টর, সাউন্ড সিস্টেম ও বৈদ্যুতিক ফ্যানসহ নানা সরকারি সরঞ্জাম চুরির ঘটনা ঘটেছে। ফলে সরকারি সম্পদের ক্ষতির পাশাপাশি প্রাত্যহিক ডিজিটাল শিক্ষা কার্যক্রমও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি এসএক মোহাম্মদ আলী দুলাল ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম জানান, প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরির অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাঁদের পদোন্নতি না দিয়ে সরাসরি নতুনদের নিয়োগ দেওয়ায় শিক্ষকদের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। আইনি জটিলতার দরুন চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা প্রাথমিক শিক্ষার সার্বিক গুণগত মানকে ব্যাহত করছে।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মহসিন আলী জানান, সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির বিষয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান থাকায় প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত রয়েছে। তবে শূন্যপদের হালনাগাদ তালিকা নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হচ্ছে এবং আইনি নিষ্পত্তি শেষে দ্রুত এই সংকট দূর হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।