ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এ শিগগিরই জোরালো হামলা চালানো হতে পারে বলে কঠোর হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের নাতাঞ্জে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র ও প্রধান স্থাপনার কাছেই অবস্থিত এই সুউচ্চ পাহাড়ের গভীরে অত্যন্ত নিখুঁত এবং শক্তিশালী সুরক্ষাবলয় তৈরি করে ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটি নির্মাণ করেছে দেশটি। চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র তীব্র মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত ও চরম মানসিক স্নায়ুযুদ্ধের মধ্যে ট্রাম্পের এই নতুন ও সরাসরি সামরিক হুমকি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতিতে এক নতুন তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে উপস্থিত সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেন যে, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন এলাকায় কারা নিয়মিত চলাফেরা করছে এবং সেখানে কী ধরনের গোপন প্রস্তুতি চলছে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল রয়েছে। এর আগে গত বছরের জুলাই মাসেও তিনি এই নির্দিষ্ট ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাটি যেকোনো সময় গুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি প্রদান করেছিলেন। সে সময় তিনি ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যেকোনো মারাত্মক পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুত থাকারও হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।
আমেরিকান ট্রাম্পের এই নতুন হুমকির মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংঘাতের মাত্রা চরম আকার ধারণ করে। ইরানের খার্গ দ্বীপের কাছে অবস্থানরত একটি বাণিজ্য তেলের ট্যাংকারে পরপর চারটি মার্কিন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আঘাত হানে বলে ইরানের নিজস্ব সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে। ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপ হলো সমগ্র ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান ও মূল কেন্দ্রবিন্দু। ভৌগোলিক পরিসংখ্যানে জানা যায়, দেশটির মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই একটি কৌশলগত দ্বীপের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে।
ভূগোলের নিরিখে ইরানে ‘কুহ-ই কোলাং গাজ লা’ নামে পরিচিত এই আলোচিত ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ মূলত দেশটির রাজধানী তেহরান থেকে আনুমানিক ২২০ কিলোমিটার দক্ষিণে পাহাড়ি ইসফাহান প্রদেশে অবস্থিত। নাতাঞ্জের বিশ্বপরিচিত ও বিতর্কিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কারখানা থেকে এই সুরম্য পাহাড়টির দূরত্ব মাত্র প্রায় দুই কিলোমিটার।
মার্কিন শীর্ষ গোয়েন্দা বিভাগের গোপন তথ্য বিশ্লেষণ করে দাবি করা হয়েছে যে, বিশাল ও দুর্ভেদ্য এই পাহাড়টির ভেতরের অংশে মাটির কয়েক শ মিটার গভীরে অত্যাধুনিক এবং সুরক্ষিত একটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনা নির্মাণ করেছে ইরান। যার মূল কেন্দ্রীয় কক্ষগুলো মাটির তলদেশ থেকে অন্তত ১০০ মিটার গভীরে অবস্থিত বলে আন্তর্জাতিক মিলিটারি বিশেষজ্ঞদের অনুমান। এর সুনির্দিষ্ট পরিণতি হিসেবে, পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ও শক্তিশালী ক্ষতিকারক 'বাংকার বিধ্বংসী' বিশেষ মিসাইল বা বোমা দিয়েও এই শক্ত পাহাড়ি আস্তানাটি ধ্বংস করা কিংবা মারাত্মক ক্ষতিসাধন করা চরম কঠিন ও প্রায় অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত হাই-রেজুলেশন চিত্র ও তথ্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে গবেষণা সংস্থা 'ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি' ইতিপূর্বে স্পষ্ট জানিয়েছে, দুর্গম পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের ভেতরের এই জটিল স্থাপনাটি এখনো সম্পূর্ণ নির্মাণাধীন রয়েছে এবং এর পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক বা সামরিক কার্যক্রম এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। তা সত্ত্বেও একাধিক অভিজ্ঞ পশ্চিমা সামরিক ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকের দৃঢ় ধারণা, অতীতে ইরানের ঘোষিত প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আক্রমণ চালানের পর সেগুলোর বিকল্প হিসেবে অত্যন্ত গোপনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়াকে নির্বিঘ্নে চালু রাখার জন্য কৌশলগত অংশ হিসেবেই এই অক্ষত ও নিরাপদ ভূগর্ভস্থ মেগা-স্থাপনাটি তৈরি করে রাখা হয়ে থাকতে পারে।
সামরিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন স্থাপনাটির সবচেয়ে বড় গুরুত্ব ও বিশেষত্ব হলো, নানা হামলা ও টানাপোড়েনের মধ্যেও এটি এখনো পুরোপুরি অক্ষত রয়ে গেছে। ২০২৫ সালের জুন মাসে ইরানের ফোরদো, নাতাঞ্জ ও প্রধান ইসফাহানের প্রতিষ্ঠিত ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক কারখানাগুলোতে মার্কিন বাহিনী ভয়াবহ হামলা চালালেও দুর্গম এই পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন সেবার সরাসরি সামরিক লক্ষ্যবস্তু বা আক্রমণের শিকার হয়নি। তাই চলমান মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্ব রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যেও এই আধুনিক স্থাপনাটির কোনো দৃশ্যমান ও অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষয়ক্ষতির নির্ভরযোগ্য কোনো আলামত আন্তর্জাতিক নজরদারিতে আসেনি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের উপর্যুপরি হামলায় সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের প্রাথমিক সেন্ট্রিফিউজ উৎপাদনকেন্দ্র ও প্রধান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলোর বেশ কিছু কেন্দ্র ব্যাপকভাবে বিধ্বস্ত ও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে স্বাধীন বিশ্ব বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে নিজেদের অবরুদ্ধ পারমাণবিক সক্ষমতা ও কার্যক্রম পুনরায় নতুন উদ্যমে ঢেলে সাজাতে এবং পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন ইরানের প্রধান ভরসাস্থল হয়ে উঠতে পারে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেখানে অত্যাধুনিক সেন্ট্রিফিউজের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ গোপন প্রক্রিয়ায় দ্রুত তৈরি, নিখুঁত সংযোজন কিংবা চরম মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সংবেদনশীল কাজ দ্রুত শুরু করা সম্ভব।
বিগত জুলাইয়ে মার্কিন স্বনামধন্য সাময়িকী 'দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল'-এর প্রকাশিত এক বিশেষ চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে নিশ্চিত গোয়েন্দা তথ্য প্রদান করে সতর্ক করেছিল যে, বিগত বছরের শেষ দিকে তড়িঘড়ি করে হাজার হাজার কার্যক্ষম সেন্ট্রিফিউজ গোপনে সরিয়ে এই সুরক্ষিত পাহাড়ি গোডাউনে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে হোয়াইট হাউস বা মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর সে সময় এই খবরের সত্যতা সরাসরি নিশ্চিত করেনি।
২০২৫ সালের ধ্বংসাত্মক সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক গবেষণায় জানা যায়, ইরানের বিখ্যাত নাতাঞ্জ ও ফোরদোতে স্থাপন করা ও চালু থাকা আনুমানিক ১৮ হাজার আধুনিক সেন্ট্রিফিউজের একটি বড় অংশ এক লহমায় ধ্বংস হয়ে যায় বলে 'ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস'-এর নিরপেক্ষ মূল্যায়নে তথ্য উঠে এসেছিল। তৎকালীন হামলায় ইরানের অন্যতম কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেন্ট্রিফিউজ তৈরির প্রধান কারখানা ও দেশটির একমাত্র 'ইয়েলোকেক' উৎপাদন কেন্দ্রটিও বড় ক্ষতির মুখে পতিত হয়।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ২০২৬ সালের মার্চে নিশ্চিত করেছিল যে, নাতাঞ্জের বিস্তৃত ভূগর্ভস্থ সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের বহিঃস্থ প্রবেশপথের ভবনগুলো নতুন সামরিক আঘাতে ধসে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ভেতরের অত্যন্ত গভীরে অবস্থিত মূল গোপন স্থাপনায় অতিরিক্ত বড় কোনো বিপর্যয়ের জোরালো প্রমাণ তাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। পরবর্তীতে 'ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির' জুনের প্রকাশিত এক জরুরি রিপোর্টে বলা হয়, ইরানের তিনটি প্রধান ও স্বীকৃত পারমাণবিক কেন্দ্রের সংযোগকারী টানেলের প্রবেশদ্বারগুলো এখনো সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ ও বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। ফলে সেখানে নতুন করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কার্যকর কোনো তৎপরতা চলছে কি না—তার কোনো অকাট্য জোরালো প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না।
২০২৫ সালের জুনের সফল হামলার রেশ ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি তুলেছিলেন, সামরিক অভিযানে ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক ঘাঁটি 'সম্পূর্ণ ও চিরতরে ধ্বংস' করে দেওয়া হয়েছে। তবে এর কয়েক দিন পরই মার্কিন গোয়েন্দা নথির এক চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁসের পর জানা যায়, স্থাপনাগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পুরোপুরি মাটির সাথে মিশে যায়নি। সেই প্রাথমিক রিপোর্টে ধারণা করা হয়, হামলাটি ইরানের দীর্ঘদিনের পারমাণবিক কর্মসূচির গতিকে অনধিক ছয় মাসের জন্য পিছিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল।
বর্তমানে ইরানের গোপন পারমাণবিক কর্মসূচির বাস্তব চিত্র সম্পর্কে বিশ্বজুড়ে চরম ধোঁয়াশা ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সূত্রের খবর অনুযায়ী, বর্তমানে ইরানের হাতে প্রায় ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রার (৬০ শতাংশ পর্যন্ত) সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অর্জিত অবস্থায় গচ্ছিত রয়েছে। মূলত যেকোনো শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্র বা অ্যাটম বোমা নির্মাণের জন্য সাধারণত ৯০ শতাংশ কিংবা তার চেয়ে বেশি মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন পড়ে। তবে ধ্বংসাত্মক সামরিক হামলার পর থেকে আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার কোনো নিরপেক্ষ পরিদর্শককে ইরানের কোনো স্পর্শকাতর কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রবেশ করতে দেয়নি তেহরান। ফলে বর্তমানে দেশটির মজুতকৃত বিপুল পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ঠিক কোথায় সুরক্ষিত রাখা হয়েছে, সে সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা সম্ভব হচ্ছে না।
ইরান সরকার শুরু থেকেই বারবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাবি জানিয়ে আসছে যে, তাদের দেশীয় পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে এবং পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য নিবেদিত, সেখানে কোনো প্রকার পারমাণবিক বোমার সমরাস্ত্র তৈরির গোপন রূপরেখা বা উদ্দেশ্য নেই। তবে মার্কিন বিমান হামলার পর আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সাথে দেশটির স্বাভাবিক কূটনৈতিক সহযোগিতা বহুলাংশে থমকে যাওয়ায় পারমাণবিক সক্ষমতার মূল খবরের হালনাগাদ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসি এক চরম সতর্কবার্তায় জানিয়েছেন, ইরানের নিকট থাকা প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ মাত্রার ইউরেনিয়ামকে তাত্ত্বিকভাবে ও দ্রুততার সাথে যদি ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতায় উন্নীত করে ফেলা যায়, তবে তা দিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই ১০টিরও বেশি শক্তিশালী পারমাণবিক যুদ্ধাশ্র বা পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরি করে ফেলা সম্ভব। তবে এই বিশাল বিষাক্ত উপাদানের বর্তমান সঠিক অবস্থান একেবারেই অস্পষ্ট। এই সুনির্দিষ্ট কারণেই মাটির শত মিটার গভীরে নির্মিত সম্পূর্ণ অক্ষত ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ বিশ্ব নিরাপত্তা ও মার্কিন সামরিক নীতিনির্ধারকদের কাছে চরম আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা দুই দেশের চরম সংঘাতকে যেকোনো মুহূর্তে বড় আকারের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।