পাকিস্তানের সাবেক বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সুচিকিৎসা ও জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাবেক সতীর্থ ও কিংবদন্তি পেসার ওয়াসিম আকরাম। দীর্ঘ তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে বন্দি থাকা ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে যখন উত্তাপ ছড়াচ্ছে, ঠিক তখনই একজন বন্ধু ও মেন্টরের প্রতি ভালোবাসার টানে নিজের মনের নীরবতা ভাঙলেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া গণমাধ্যম ‘দ্য অ্যাথলেটিক’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে আকরাম আবেগঘন কণ্ঠে জানান, আইনি বা রাজনৈতিক বিতর্ক যা-ই থাকুক না কেন, একজন অসুস্থ মানুষের সুচিকিৎসা এবং জীবনরক্ষার বিষয়টি সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখা প্রয়োজন।
ইমরান খান গত তিন বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে চিকিৎসাধীন ও বন্দি অবস্থায় রয়েছেন। তবে সম্প্রতি তাঁর স্বাস্থ্যের আকস্মিক অবনতির খবরে ক্রীড়াবিশ্বে রীতিমতো উদ্বেগের ঝড় উঠেছে। তাঁর মুক্তি ও সঠিক চিকিৎসার দাবিতে সম্প্রতি বিশ্বের ২২ জন সাবেক ও বর্তমান ক্রিকেট অধিনায়কের একটি প্রতিনিধি দল একত্রিত হয়ে পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে এক খোলা চিঠি পাঠিয়েছেন। যেখানে ক্রিকেট কিংবদন্তির মৌলিক মানবাধিকার ও উন্নত চিকিৎসার নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক সার্কিটের তারকাদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় অধিনায়ক প্যাট কামিন্স প্রথম প্রকাশ্যে এই চিঠির দাবির সাথে সংহতি প্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে কিংবদন্তি ব্যাটার ব্রায়ান লারাও প্রকাশ্যে আসেন এবং ইমরান খানের পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুনিশ্চিত করার পক্ষে সোচ্চার বক্তব্য রাখেন।
আন্তর্জাতিক মহল ছাড়াও খোদ পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ক্রীড়াঙ্গন থেকে ইমরান খানের জন্য জোরালো আওয়াজ উঠছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের এক সময়ের খ্যাতনামা ব্যাটার জাভেদ মিয়াঁদাদ এক আবেগঘন সাক্ষাৎকারে চোখের জল ফেলে সাবেক অধিনায়কের দ্রুত মুক্তি দাবি করেন। তাঁর এই কান্নাভেজা আকুতির পরপরই সাবেক দুই তারকা ক্রিকেটার মঈন খান ও রমিজ রাজাও সুর মিলিয়ে ইমরান খানের শারীরিক নিরাপত্তা ও চিকিৎসার পক্ষে কথা বলেন।
সেই ধারাবাহিকতায় এবার যোগ দিলেন ওয়াসিম আকরাম। স্বদেশে অবস্থানরত আকরাম দ্য অ্যাথলেটিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘ইমরান খান আমার শুধুই একজন সাবেক সতীর্থ নন, তিনি আমার অভিভাবক ও অত্যন্ত কাছের বন্ধু। গত তিন বছর ধরে তাঁর সঙ্গে আমার সরাসরি কোনো যোগাযোগ বা কথা হয়নি। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর সঙ্গে যা ঘটছে, তা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। বিচারপ্রক্রিয়া কিংবা আদালতের কাজ আদালতের মতো চলবে—সে বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। কিন্তু একজন মানুষের স্বাস্থ্যের বিষয়ে কোনো ধরনের অবহেলা বা আপস কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’
সাম্প্রতিক সময়ে ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের চলমান টেস্ট সিরিজের সম্প্রচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই স্পোর্টস লর্ডস টেস্টের প্রথম দিনের মধ্যাহ্নবিরতির সময় এক বিশেষ প্রতিবেদন প্রচার করে। যেখানে ইমরান খানের দুই সন্তান সুলেইমান ও কাসিম খানের একটি অনুভূতির কথা স্থান পায়। সাক্ষাৎকারে ইমরান খানের দুই সন্তান তাঁদের বাবার নিরাপত্তা ও জীবন নিয়ে গভীর শঙ্কার কথা প্রকাশ করেন। পরে জানা যায়, স্কাই স্পোর্টসে এই সাক্ষাৎকার সম্প্রচারের প্রতিবাদে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) তীব্র আপত্তি জানায়, যা নিয়ে বেশ তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এমনকি প্রতিবাদ হিসেবে পাকিস্তান দলের মাঠে না নামার শঙ্কা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়েই মাঠে নেমেছিল সফরকারী দলটি।
উক্ত সাক্ষাৎকারের প্রেক্ষাপট ও সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতির বিষয়টি টেনে আকরাম বলেন, ‘ওই সাক্ষাৎকার প্রচারিত হওয়ার পর পাকিস্তানে বেশ আলোচনা ও হইচই হয়েছিল। পরবর্তীকালে আমি জানতে পেরেছি যে, ইমরান খানের সঙ্গে কারাগারে কতবার পরিবারের সাক্ষাৎ হয়েছে কিংবা কতবার ফোনে কথা বলা হয়েছে—পাকিস্তান সরকার সব হিসাব ও তথ্য সামনে এনেছে। কিন্তু সত্যি বলতে, বর্তমানের প্রেক্ষাপটে কোন কথাটি সত্যি আর কোনটি মিথ্যা—তা বিশ্বাস করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পরও তাঁর সঙ্গে আমার অত্যন্ত সুসম্পর্ক ছিল। নিয়মিত দেখা করতাম, তাঁর সঙ্গে সময় কাটাতাম। রাজনীতি বাদ দিয়ে শুধু একজন পরম বন্ধুর জায়গা থেকে আমি তাঁকে গভীরভাবে মিস করি।’
সাক্ষাৎকারের শেষভাগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আকরাম আরও বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি যে ইংল্যান্ডসহ পৃথিবীর নানা প্রান্তে ইমরান খানের অবস্থার উন্নতির জন্য আন্দোলন বা প্রতিবাদের ঝড় উঠছে। তবে পাকিস্তানের মাটিতে পরিস্থিতি ঠিক কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে আমি মোটেও নিশ্চিত হতে পারছি না। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে তাঁর জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে আমি চরম উৎকণ্ঠায় আছি। মন থেকেই কথাগুলো বলছি। তিনি আদালতের বিচারে দোষী সাব্যস্ত হোন কিংবা না হোন, কিংবা জেলেই থাকুন না কেন—আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত তাঁর স্বাস্থ্য ও জীবন সুরক্ষায়। মূল খবর কী বা ভেতরে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটছে, তার নিশ্চিত তথ্য আমরা কেউ জানি না। যদিও সরকার বারবার বলছে তাঁর স্বাস্থ্য ভালো আছে, তবুও আমার মন শান্ত হচ্ছে না। আমি আমার মেন্টরকে মিস করি এবং তাঁর ভালো থাকার প্রার্থনা করি।’