উপসাগরীয় অঞ্চলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ছয় মাসে গড়ালেও দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার পারদ আরও বাড়ল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলায় অঞ্চলজুড়ে চরম উদ্বেগ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ইরান এখনো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ রেখেছে, যার জবাবে ওয়াশিংটন ইরানের বিভিন্ন বন্দরে নৌশৃঙ্খলা ও অবরোধ বজায় রেখেছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯৯ দশমিক ৪৬ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সূত্রমতে, কাতারভিত্তিক এই সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, জর্ডানের ওপর দিয়ে ইরানের ছোড়া ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শনাক্ত করে আকাশে ধ্বংস করে দিয়েছে। বাকি দুটি ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিহীন এলাকায় গিয়ে পড়েছে। এতে কোনো ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। জর্ডান সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ দল ইতিমধ্যে এলাকাগুলো ঝুঁকিমুক্ত করতে কাজ শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক সংবাদ বিবৃতিতে দাবি করেছে, গত দুই দিনে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) মার্কিন যুদ্ধজাহাজে অন্তত দুবার হামলার চেষ্টা চালায়। তবে মার্কিন জাহাজগুলো সফলভাবে এসব হামলা এড়াতে সক্ষম হয় এবং কোনো আমেরিকান সেনা বা কর্মী আহত হননি।
এই চেষ্টার পাল্টা জবাবে ওমান উপসাগরে ইরানের চারটি তেলবাহী ট্যাংকার অচল করে দেয় সেন্টকম। ট্যাংকারগুলো হলো—এম/টি কাভিজ, এম/টি চারমিনার, এম/টি হরাইজন-১ এবং এম/টি রিয়েস্কো। এর পাশাপাশি ইরানের তেল রপ্তানির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের কাছে থাকা এম/টি দেরিয়া নামের আরও একটি ট্যাংকারে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের পুরো তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই খার্গ দ্বীপের মাধ্যমে সম্পাদিত হতো। সেন্টকম জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার আগে জাহাজের কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেখান থেকে সরে যেতে বলা হয়েছিল।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি খার্গ দ্বীপ ও ওমান উপসাগরের দক্ষিণাঞ্চলীয় জাস্ক বন্দরের কাছে ইরানি তেল ট্যাংকারে আক্রমণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে তারা জানায়, সেন্টকমের সতর্কবার্তার পর নাবিকদের দ্রুত সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ইরানের আইআরজিসি এক সংবাদ বিবৃতিতে নিশ্চিত করে, তাদের বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন হামলা হয়েছে। তবে তারা থেমে না থেকে অবিলম্বে জর্ডানে অবস্থানরত মার্কিন সেনা ঘাঁটি আল-আজরাককে লক্ষ্য করে তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। আইআরজিসির দাবি, তাদের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধবিমান রাখার বেশ কয়েকটি বিমানাগার (হ্যাঙ্গার) পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে।
আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, এর আগে তারা মার্কিন নৌবাহিনীর ‘ডিডিজি-১১৯’ এবং ‘ডিডিজি-৫৩’ নামক ডেস্ট্রয়ার দুটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছিল, যাতে যুদ্ধজাহাজ দুটির ব্যাপক ও উল্লেখযোগ্য ক্ষতিসাধন হয়েছে।
উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে আইআরজিসি নতুন করে সতর্কতা জারি করেছে। কুয়েত ও বাহরাইনের বিভিন্ন বন্দরে অবস্থানরত বা নোঙর করে রাখা সমস্ত বাণিজ্যিক ও তেলবাহী ট্যাংকার ছেড়ে দ্রুত কর্মীদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে তারা। সতর্কবার্তায় আইআরজিসি জানায়, ওই অঞ্চলে অবস্থানরত বা চলাচলকারী যেকোনো তেলবাহী জাহাজ তাদের পরবর্তী হামলার সরাসরি লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
এদিকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ আলী আবদোল্লাহি রাষ্ট্রীয় টিভিতে মার্কিন বাহিনীকে হুঁশিয়ার করে বলেছেন, তাদের তেলবাহী ট্যাংকারে আঘাত হানা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রতিটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সশস্ত্র বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
ইরানি প্রেসিডেন্টের এই হুঁশিয়ারির জবাবে কলম্বিয়া সফররত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের সরাসরি জানান, ওয়াশিংটন ইরানের জাহাজে অভিযান অব্যাহত রাখবে। তিনি বলেন, ইরান যেভাবে মার্কিন নৌপোতে হামলা বা আক্রমণের চেষ্টা চালাচ্ছে, ঠিক ততবারই জবাব হিসেবে তেহরানকে তাদের তেলবাহী ট্যাংকার হারাতে হবে।
(তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, মার্কিন সেন্টকম ও আইআরআইবি)