সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বারবার মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা ঠেকাতে শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ ও অতিরিক্ত খরচ বন্ধে ইতোমধ্যে একাধিক নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেন, সরকারি প্রকল্পে মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে মূলত দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, যথাযথ ব্যয় প্রাক্কলন না করা, ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল মনিটরিং ও জবাবদিহির ঘাটতিসহ বিভিন্ন জটিল কারণ জড়িত রয়েছে।
বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এদিন বিকেল সাড়ে ৩টায় জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদীয় অধিবেশনের বৈঠক শুরু হয়। অধিবেশনের শুরুতে লিখিত প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী সরকারের উন্নয়ন নীতি ও প্রকল্পের গতি ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণত কোনো একক কারণে হয় না; বরং প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন, ক্রয় প্রক্রিয়া ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার একাধিক প্রশাসনিক দুর্বলতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই সমস্যা তৈরি করে।
তিনি জানান, প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বারবার বাড়ানোর ক্ষতিকর প্রবণতা সরকারের দৃষ্টিগোচর হওয়ার পর তা নিরসনে বেশ কিছু যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে শতভাগ নির্ভুল ও মানসম্মত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রকল্প অনুমোদনের পরপরই বাস্তবায়ন প্রস্তুতি দ্রুততম সময়ে শেষ করার দিকনির্দেশনা অন্যতম।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধনের বিদ্যমান নির্দেশিকা সময়োপযোগী ও আধুনিক করার কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। এছাড়া চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি সার্বক্ষণিক মনিটরিং করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোতে ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড স্থাপন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিয়মিত প্রকল্প পর্যালোচনা এবং মাঠপর্যায়ে নিবিড় তদারকি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে।
ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের জটিল কাজ দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্ট সকল সেবা সংস্থার মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় জোরদার করা হচ্ছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, নির্ধারিত সময়ে যেসব প্রকল্প শেষ হয়নি, সেগুলোর বিলম্ব, অনিয়ম, ব্যয় বৃদ্ধি ও বারবার সংশোধনের মূল কারণ খতিয়ে দেখে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিলম্বের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
তিনি জানান, যেসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৩০ শতাংশের কম, সেগুলোর সার্বিক উপযোগিতা ও কার্যকারিতা পুনঃমূল্যায়ন করা হচ্ছে। প্রয়োজনানুসারে প্রকল্প পুনর্বিন্যাস, স্কোপ পরিবর্তন কিংবা প্রকল্প অব্যাহত রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগসমূহ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। বিচ্ছিন্নভাবে ছোট ছোট প্রকল্প না নিয়ে সমন্বিত কর্মসূচির অধীনে গুচ্ছ প্রকল্প গ্রহণের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা আনতে ই-জিপি ব্যবহারের পরিধি আরও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের পেশাগত যোগ্যতা, দক্ষতা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে, যার জন্য বিদ্যমান নীতিমালা হালনাগাদ করার কাজ চলছে।
এছাড়া অর্থনৈতিক সামর্থ্য বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) মডেলে প্রকল্প গ্রহণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়াকে আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল ২০২৫’ হালনাগাদের সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।