চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের এআই মডেল থেকে মালিকানাধীন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা পদ্ধতিগতভাবে সংগ্রহ করছে—ওয়াশিংটনের এমন অভিযোগের পর তা প্রত্যাখ্যান করেছে বেইজিং। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘মিথ্যা অভিযোগ’ ছড়ানো বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে চীন।
বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেন, চীনে এআইয়ের বিকাশ নিজেদের সক্ষমতা ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে শক্তিশালী হওয়ার ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে ব্যাপক পরামর্শ, যৌথ অবদান এবং সবার জন্য অভিন্ন সুবিধা নিশ্চিত করার চীনা দৃষ্টিভঙ্গি।
মাও নিং বলেন, চীনের এআই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হলো উন্মুক্ত সহযোগিতার প্রতি দেশটির প্রতিশ্রুতি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এআই প্রযুক্তির বিকাশ এমনভাবে হওয়া প্রয়োজন, যাতে তা উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয় এবং মানবজাতির কল্যাণে ইতিবাচক শক্তি হিসেবে কাজ করে।
তিনি বলেন, এআইয়ের উন্নয়ন যেন কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা গোষ্ঠীর স্বার্থে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং প্রযুক্তিটির সুবিধা যাতে বৃহত্তর মানবসমাজের জন্য নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মাও নিং বলেন, দুই দেশের প্রেসিডেন্টদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যেসব অভিন্ন বোঝাপড়া হয়েছে, ওয়াশিংটনের উচিত সেগুলো আন্তরিকভাবে বাস্তবায়ন করা। একই সঙ্গে চীনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য ‘মিথ্যা অভিযোগ’ ছড়ানো বন্ধ করার আহ্বান জানান তিনি।
মাও নিং আরও বলেন, এআই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই বড় শক্তি। তাই দুই দেশের উচিত পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও বিরোধ বাড়ানোর পরিবর্তে সহযোগিতা আরও জোরদার করা।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের এসব মন্তব্য আসে যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার প্রতিরক্ষা সংস্থার একটি অভিযোগের পর। মঙ্গলবার মার্কিন সংস্থাটি দাবি করে, চীনভিত্তিক কয়েকটি এআই কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের এআই মডেল থেকে মালিকানাধীন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা পদ্ধতিগতভাবে সংগ্রহ করছে।
মার্কিন সাইবার প্রতিরক্ষা সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো শিল্প-পর্যায়ের ‘নলেজ ডিস্টিলেশন’। তাদের দাবি, এটি চীনা এআই উন্নয়ন কৌশলের কোনো গৌণ বা সহায়ক পদ্ধতি নয়; বরং এআই সক্ষমতা তৈরির কৌশলের একটি কেন্দ্রীয় অংশ।
‘নলেজ ডিস্টিলেশন’ বলতে সাধারণভাবে একটি উন্নত এআই মডেল থেকে তার জ্ঞান, আচরণ ও সক্ষমতার বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ করে অপেক্ষাকৃত অন্য একটি মডেলের সক্ষমতা উন্নত করার প্রক্রিয়াকে বোঝানো হয়। তবে এ প্রক্রিয়া কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং তা প্রযুক্তিগত বা আইনি সীমা লঙ্ঘন করেছে কি না, তা নিয়ে দুই দেশের বক্তব্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে।
মার্কিন সংস্থাটি বিশেষভাবে ডিপসিক, মুনশট এআই, আলিবাবা, মিনিম্যাক্স, স্টেপফান এবং জেড ডট এআইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। সংস্থাটির দাবি, এসব চীনভিত্তিক কোম্পানি ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় এআই মডেলগুলোর সঙ্গে লাখ লাখবার আদান-প্রদানের মাধ্যমে বিলিয়ন বিলিয়ন টোকেন সংগ্রহ করেছে।
মার্কিন অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্লড, জিপিটি, জেমিনি এবং গ্রোকের মতো উন্নত এআই মডেল থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য ও সক্ষমতা আহরণ করা হয়েছে। মার্কিন সাইবার প্রতিরক্ষা সংস্থার ধারণা, এসব কার্যক্রম সম্পর্কে চীনা সরকারের সচেতনতা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে চীন এ অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়। বেইজিংয়ের বক্তব্য হলো, দেশটির এআই সক্ষমতা মূলত নিজস্ব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, গবেষণা এবং উদ্ভাবনের মাধ্যমে গড়ে উঠছে। চীন বরাবরই প্রযুক্তিগত উন্নয়নে উন্মুক্ত সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলে আসছে।
এআই প্রযুক্তি নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে উন্নত এআই মডেল, চিপ, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ঘিরে দুই দেশের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগের পর চীনের পাল্টা প্রতিক্রিয়া দুই দেশের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। ওয়াশিংটন যেখানে চীনা কোম্পানিগুলোর এআই সক্ষমতা অর্জনের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, সেখানে বেইজিং অভিযোগগুলোকে চীনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার হিসেবে দেখছে।
মাও নিংয়ের বক্তব্যে দুই দেশের মধ্যে এআই খাতে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি মনে করেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই এআইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হওয়ায় তাদের মধ্যে সহযোগিতা শুধু দুই দেশের জন্য নয়, বৃহত্তর মানবসমাজের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এদিকে মার্কিন অভিযোগের পর সংশ্লিষ্ট চীনা এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে আলাদাভাবে কোনো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে দুই দেশের অবস্থান এখনো সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। এআই প্রযুক্তির মালিকানা, জ্ঞান আহরণ, মডেল প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিয়ে ভবিষ্যতে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ আরও বিস্তৃত হয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি