পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক মোড় ঘুরল। দীর্ঘ ২৮ বছরের পথচলায় এই প্রথম কোনো নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে দলীয় প্রতীক 'জোড়াফুল' ছাড়াই ভোটের ময়দানে নামতে হচ্ছে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসকে। আসন্ন রেজিনগর ও নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজ হাতে আঁকা এই বিখ্যাত প্রতীকের ব্যবহারের ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশ জারি করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন।
দলীয় অভ্যন্তরীণ চরম কোন্দল ও ভাঙনের জেরেই মূলত এই নজিরবিহীন সংকটের সৃষ্টি। বিদ্রোহী তৃণমূল নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুসারীরা নিজেদের 'প্রকৃত তৃণমূল' দাবি করে জোড়াফুল প্রতীকের মালিকানা চেয়ে নির্বাচন কমিশনে আবেদন জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার রাতে কমিশন এক নির্দেশনায় স্পষ্ট জানায়, দলের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক কে, মূল তৃণমূল কংগ্রেস কোনটি এবং দলীয় সম্পদের মালিকানা কার হাতে থাকবে— এসব আইনি প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষই এই প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না।
কমিশনের এ আদেশের ফলে আগামী ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনে মমতাপন্থী কিংবা ঋতব্রতপন্থী— কোনো শিবিরের প্রার্থীরাই তাদের চিরাচরিত জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছেন না। শুধু তা-ই নয়, 'সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস' নামটিও আপাতত কোনো গোষ্ঠী ব্যবহার করতে পারবে না। দুই শিবিরকেই নির্বাচন কমিশনের সংরক্ষিত তালিকা থেকে নতুন ও পৃথক প্রতীক নির্বাচন করে লড়াইয়ে নামতে হবে। তবে কমিশন এটিকে চূড়ান্ত রায় হিসেবে উল্লেখ করেনি; সার্বিক পর্যালোচনার পর ভবিষ্যতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
এই রাজনৈতিক জটিলতার সূচনা হয় গত ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর। ওই নির্বাচনে ২৯৪টি আসনের মধ্যে তৃণমূল ৮০টিতে জয়ী হয়েছিল। তবে ফল প্রকাশের পরপরই দলের প্রভাবশালী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং ৮০ জন নির্বাচিত বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জনই তাঁর দিকে অবস্থান নেন। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ঋতব্রত। সেই থেকেই মূলত কালীঘাট ও বিদ্রোহী শিবিরের মধ্যকার মালিকানার লড়াই গড়ায় নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত।
উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ত্যাগ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন নতুন দল গঠন করেন, তখন তিনি নিজে স্কেচ করে সাধারণ মানুষের প্রতীক হিসেবে এই জোড়া ঘাসফুল এঁকেছিলেন। টানা তিন দশক ধরে যা ছিল তাঁর রাজনীতির প্রধান পরিচয়, সেই প্রতীক হাতছাড়া হওয়া মমতাপন্থী শিবিরের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।