আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতার অবসান ঘটিয়ে যুক্তরাজ্যে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্টে আটকে থাকা ভেনেজুয়েলার প্রায় চার বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের গচ্ছিত স্বর্ণ যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। নিউইয়র্কের অবস্থানরত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক 'ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক'-এ এই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের মজুত সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ভেনেজুয়েলার বর্তমান সরকার ও বিরোধী পক্ষ একটি ঐতিহাসিক সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম 'ফিন্যান্সিয়াল টাইমস'-এর বিশেষ প্রতিবেদনের সূত্র ধরে বিশ্বখ্যাত বার্তা সংস্থা 'রয়টার্স' এই খবর নিশ্চিত করেছে।
প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী, ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যুক্তরাজ্যের হাত থেকে এই স্বর্ণের ওপর পূর্ণ আইনি নিয়ন্ত্রণ পেতে পারে। তবে আইনি কর্তৃত্ব লাভ করলেও সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী ভেনেজুয়েলা সরকার এই মূল্যবান স্বর্ণ উন্মুক্ত বাজারে সাথে সাথে বিক্রি করতে পারবে না। বরং গত জুনে দেশে আঘাত হানা ভয়াবহ দুটি ভূমিকম্পের ধ্বংসলীলার পর জাতীয় পুনর্গঠন কার্যক্রম পরিচালনা এবং দীর্ঘদিনের লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক ঋণের জামানত হিসেবে এই স্বর্ণ ব্যবহার করতে পারবে কারাকাস প্রশাসন।
এদিকে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে রাখা ভেনেজুয়েলার স্বর্ণের মালিকানা কার হাতে থাকবে, সেই সংক্রান্ত চলমান আইনি প্রক্রিয়ায় যুক্তরাজ্য সরকার সরাসরি কোনো পক্ষ নয়। কারণ যুক্তরাজ্যের বিচার বিভাগ ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সরকারের প্রভাবমুক্ত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। অপরদিকে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড জানিয়েছে, ওই অ্যাকাউন্টের ওপর কার বৈধ কর্তৃত্ব রয়েছে সে বিষয়ে দেশের আদালতের সুনির্দিষ্ট ও পরবর্তী নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত তারা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে না।
উল্লেখ্য, ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভূগর্ভস্থ ভল্টে বছরের পর বছর ধরে ভেনেজুয়েলার প্রায় ৩১ মেট্রিক টন অতিমূল্যবান স্বর্ণ সংরক্ষিত রয়েছে। ২০১৯ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর নির্বাচনকে কারচুপিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে যুক্তরাজ্য সরকার তৎকালীন বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে সমর্থন দেওয়ার পর থেকেই এই গচ্ছিত সম্পদের হস্তান্তর আটকে যায়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মাদুরো মার্কিন হেফাজতে যাওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ স্বয়ং ব্রিটিশ রাজা চার্লসের কাছে চিঠি লিখে স্বর্ণ ফেরতের আবেদন জানালেও আইনি জটিলতা মেটেনি। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজও অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে এই স্বর্ণ উদ্ধারের প্রচেষ্টা জোরালো করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বিপুল সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রে সরানোর পেছনে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার তেল চুক্তির বড় প্রভাব রয়েছে। গত আগস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল চুক্তিতে পৌঁছানোর ঘোষণা দেন, যার মাধ্যমে দেশটির ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেল তেলের মজুতের ওপর আমেরিকার ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছিলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলায় অন্তত ১০ হাজার কোটি ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত হবে।
সূত্র: রয়টার্স, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস
আকাশজমিন / আরআর