দেশে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর তাণ্ডব থামছেই না। দিন দিন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে এবং প্রতিনিয়ত প্রাণহানির পাশাপাশি আক্রান্তের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে সারাদেশে আরও ৬ জনের অকাল মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে এই মারাত্মক জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৯৩ জন নতুন রোগী। প্রতিনিয়ত রোগীর সংখ্যা এভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সারাদেশের চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত ডেঙ্গুবিষয়ক স্বাস্থ্য বুলেটিনে এই আশঙ্কাজনক তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সরবরাহ করা বার্ষিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গুতে মোট আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৪ জনে। বছরজুড়ে ডেঙ্গুর এই বিস্তার পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বছরের প্রথম দিকে সংক্রমণ ও প্রাণহানি কিছুটা কম থাকলেও মাঝের মাসগুলোতে তা তীব্র হতে শুরু করে। বছরের প্রথম দুই মাস জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুইজন করে মোট চারজন রোগী মারা যান।
এরপর মার্চ ও এপ্রিলে মৃত্যুর কোনো তথ্য না থাকলেও মে মাসে এসে একজন রোগীর প্রাণহানি ঘটে। তবে জুন মাস থেকে ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিতে শুরু করে; ওই মাসে এক লাফেই ১৩ জনের মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে জুলাই মাসে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ জনে এবং আগস্টে তা আরও আশঙ্কাজনক রূপ নিয়ে ৪৩ জনে পৌঁছায়। তবে চলতি সেপ্টেম্বরের চিত্র আরও ভয়াবহ। চলতি মাসের প্রথম ২০ দিনেই রেকর্ড ৮৭ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু তথ্য লিপিবদ্ধ হয়েছে, যা বছরের অন্যান্য মাসের তুলনায় এক বিশাল বৃদ্ধি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিন থেকে আরও জানা যায়, শনিবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাকেন্দ্রে ভর্তি হন ১ হাজার ৫৯৩ জন। নতুন এই রোগীদের হিসাব যুক্ত হওয়ার পর চলতি বছর সারাদেশে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মোট ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার ৯৭২ জনে। অন্যদিকে, চিকিৎসা শেষে সুস্থতার হারেও কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ৫৬৭ জন। সব মিলিয়ে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ৬১০ জন রোগী সুস্থ হয়ে নিজ নিজ গৃহে ফিরে গিয়েছেন।
ভৌগোলিক ও আঞ্চলিক অবস্থান অনুযায়ী ডেঙ্গুর এই সংক্রমণের গতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আক্রান্তের তালিকায় বরাবরের মতোই শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে ঢাকা বিভাগ। গত ২৪ ঘণ্টায় এই বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৬৮৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তবে ঢাকার বাইরেও দেশের প্রায় প্রতিটি বিভাগেই ডেঙ্গুর প্রকোপ মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, একই সময়ে খুলনা বিভাগে ১৯২ জন এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া নদীবেষ্টিত বরিশাল বিভাগে ১৫৪ জন এবং উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা রাজশাহী বিভাগে ১৩৭ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। বাদ যায়নি দেশের অন্যান্য অংশও; ময়মনসিংহ বিভাগে ৮২ জন এবং রংপুর বিভাগে নতুন করে ৬৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে ভর্তি হয়েছেন। দেশের সর্বত্র এভাবে আক্রান্তের বিস্তার ঘটতে থাকায় সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।