ইসলাম
ধর্মের পরম পবিত্র স্থান মক্কার মসজিদুল হারামের প্রবীণ ও সুমধুর কণ্ঠের
মুয়াজ্জিন শায়খ ইবরাহিম বিন আদেল আল-মাদানি আর
নেই। সোমবার ভোরে শুভ ফজরের ওয়াক্তে পবিত্র মক্কা নগরীতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দীর্ঘকাল ধরে
কাবা প্রাঙ্গণে সুরেল কণ্ঠে আজান ও তাকবির ধ্বনি
ছড়িয়ে দেওয়া এই প্রখ্যাত খাদেমের
আকস্মিক প্রয়াণে পবিত্র নগরী মক্কাসহ গোটা মুসলিম বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মানুষের মাঝে গভীর শোক ও বিষাদের ছায়া
নেমে এসেছে।
সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার)
মসজিদুল হারামের দায়িত্বশীল ও সহকর্মীদের পোস্টের
মাধ্যমে প্রবীণ এই মুয়াজ্জিনের ইন্তেকালের
বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়। সোমবারই পবিত্র হারাম শরিফে তাঁর জানাজা শেষে স্থানীয় গোরস্থানে দাফনের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। শায়খ ইবরাহিম আল-মাদানি মসজিদুল
হারামের ঐতিহাসিক ‘মুকাব্বিরিয়া’ বিভাগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রবীণ সদস্য
ছিলেন। মূলত প্রধান মুয়াজ্জিনদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মুকাব্বিরিয়ার সদস্যরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে ইমামের সঙ্গে সুর মিলিয়ে মুসল্লিদের কাছে অতি নিখুঁত ও স্পষ্ট ভঙ্গিতে
তাকবির পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
পবিত্র
বাইতুল্লাহর প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী মসজিদুল হারামে বর্তমানে ২৪ জন নিয়মিত
মুয়াজ্জিন দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। তাঁদের মধ্য থেকে একটি নির্ধারিত আবর্তনের মাধ্যমে প্রতিদিন ছয়জন মুয়াজ্জিন পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের আজান এবং ফজরের প্রথম আজান প্রদানের বিশেষ দায়িত্ব সম্পন্ন করেন। এই দীর্ঘ তালিকায়
শায়খ ইবরাহিম আল-মাদানি বিশেষভাবে
সমাদৃত ছিলেন ফজরের আবেগঘন ও সুরেল আজান
এবং প্রাণস্পর্শী তাকবির ধ্বনির জন্য। ভক্তদের কাছে তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল এক স্বর্গীয় প্রশান্তির
নাম। চলতি বছরের গত ১১ রবিউল
আউয়াল ১৪ ৪৮ হিজরিতে
তিনি কাবা প্রাঙ্গণে তাঁর জীবনের শেষ আজানটি প্রদান করেছিলেন। আজানের পাশাপাশি বার্ষিক পবিত্র হজ ও ঈদের
তাকবিরসহ তাঁর সুমধুর কণ্ঠের একাধিক অডিও-ভিডিও রেকর্ড বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে সংরক্ষিত ও শ্রোতাপ্রিয় রয়েছে।
ইসলামী
ইতিহাসের এক অনন্য ধারক
শায়খ ইবরাহিম আল-মাদানি ১৩৯৭
হিজরিতে পবিত্র মদিনা মনোয়ারায় একটি দ্বীনদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ধর্মীয় পরিবেশে লালিত-পালিত হওয়ার সুবাদে পারিবারিক তত্ত্বাবধানেই তিনি শৈশবে পবিত্র কোরআন হিফজ করার অনন্য গৌরব অর্জন করেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে
মদিনা নগরীর একটি স্থানীয় মসজিদে প্রথমবারের মতো মুয়াজ্জিন হিসেবে তাঁর কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয়, যা পরবর্তীতে এক
বর্ণাঢ্য জীবনযাত্রার ভিত্তি স্থাপন করে। এরপর ১৪২৮ হিজরিতে তিনি মদিনার ঐতিহাসিক মসজিদ আল-মাদ্দাহতে নিয়মিত
আজান দেওয়ার দায়িত্ব লাভ করেন। পরবর্তীতে তাঁর অসাধারণ কণ্ঠ ও সুরের দক্ষতা
বিবেচনা করে ১৪৩৯ হিজরিতে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামের মূল কেন্দ্রবিন্দু মসজিদুল হারামের মুয়াজ্জিন হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
মদিনার
পবিত্র মাটিতে শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত
করার কারণে তাঁর আজানে ‘মাদানি’ সুরের গভীর প্রভাব ছিল। পরবর্তী সময়ে বাবার হাত ধরে মক্কায় আগমনের পর তিনি মসজিদুল
হারামের খ্যাতনামা প্রবীণ মুয়াজ্জিন শায়খ আবদুল লতিফ মুল্লার সান্নিধ্য পান এবং মক্কার ঐতিহ্যবাহী আজান শৈলীও আয়ত্ত করেন। ফলে তাঁর আজানে মক্কা ও মদিনা—উভয়
পবিত্র নগরীর স্বতন্ত্র ও সুমধুর ঐতিহ্যের
অপূর্ব এক মেলবন্ধন দেখতে
পেতেন বিশ্ববাসী। তাঁর বিয়োগান্তক খবরের সত্যতা ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্বজুড়ে সৃষ্টি
হয়েছে গভীর শোকাবহ পরিবেশ। মহান আল্লাহ তাআলা এই নিষ্ঠাবান খাদেমকে
জান্নাতুল ফেরদৌসের উচ্চ মর্যাদা দান করুন।