সিঙ্গাপুরে গণপরিবহনে যাত্রীদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে নতুন নিয়ম কার্যকর হয়েছে। এখন বাসে উচ্চ শব্দে অডিও বা গান বাজানো, আসনে পা তুলে বসা, খাওয়া-দাওয়া কিংবা ময়লা ফেলার মতো আচরণ আইনগত অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এসব অপরাধে সর্বোচ্চ ৫০০ সিঙ্গাপুর ডলার জরিমানা হতে পারে।
নতুন বিধিমালা ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর করেছে সিঙ্গাপুরের স্থল পরিবহন কর্তৃপক্ষ (এলটিএ)। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গণপরিবহনে যাত্রীদের জন্য আরও নিরাপদ, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বাসে এমন কোনো আচরণ করা যাবে না, যা অন্য যাত্রীদের বিরক্ত বা অসুবিধায় ফেলে। আসনে পা তুলে বসা, উচ্চ শব্দে অডিও চালানো, বাসের ভেতরে খাওয়া বা পান করা এবং আবর্জনা ফেলার মতো আচরণ এখন সরাসরি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এসব অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ৫০০ সিঙ্গাপুর ডলার জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
তবে তুলনামূলক গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ আরও বেশি। বাস টার্মিনাল বা বাস বিনিময়কেন্দ্রে অন্য যাত্রীদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা কিংবা তাদের জন্য বিপদ তৈরি করার মতো ঘটনায় সর্বোচ্চ ৫ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার জরিমানা হতে পারে। বাস, বাস বিনিময়কেন্দ্র বা টার্মিনালের কোনো অংশ নোংরা বা ময়লা করার ক্ষেত্রেও একই সর্বোচ্চ জরিমানার বিধান রয়েছে।
সিঙ্গাপুরের স্থল পরিবহন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন বিধিমালার মাধ্যমে বাস ও রেলপথে যাত্রীদের আচরণ নিয়ন্ত্রণের কাঠামোর মধ্যে সামঞ্জস্য আনা হয়েছে। দেশটির রেল নেটওয়ার্কে এ ধরনের কিছু আচরণ নিয়ন্ত্রণে আগে থেকেই নিয়ম কার্যকর ছিল। নতুন বিধিমালার ফলে বাসেও একই ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলো।
এর আগে বাসে যাত্রীদের বিরক্তিকর আচরণ মূলত পরিবহন কোম্পানিগুলোর নিজস্ব নীতিমালার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। কোনো যাত্রী সমস্যা সৃষ্টি করলে বাসচালক তাকে আচরণ বন্ধ করতে বলতে পারতেন এবং প্রয়োজনে বাস থেকে নেমে যেতে বলার সুযোগ ছিল। নতুন ব্যবস্থায় এসব আচরণের কিছু এখন সরাসরি আইনগত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
নতুন নিয়ম বাস্তবায়নে বাসের টিকিট পরিদর্শক ও বাস বিনিময়কেন্দ্রের কর্মীদের মতো অনুমোদিত কর্মীরা ভূমিকা রাখতে পারবেন। কোনো যাত্রী অপরাধ করেছেন বলে সন্দেহ হলে তারা আনুষ্ঠানিক নোটিশ দিতে পারবেন। এরপর বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
তবে বাসচালকদের এ ধরনের আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। সিঙ্গাপুরে বাসচালকদের ‘ক্যাপ্টেন’ বলা হয়। তাদের প্রধান দায়িত্ব বাস নিরাপদে পরিচালনা করা। তাই যাত্রীদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে সরাসরি আইন প্রয়োগের অতিরিক্ত দায়িত্ব তাদের ওপর দেওয়া হয়নি।
তবে কোনো যাত্রী বিশৃঙ্খল আচরণ করলে বাসচালক তাকে তা বন্ধ করতে নির্দেশ দিতে পারবেন। নির্দেশ অমান্য করলে ওই যাত্রীকে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হতে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে বাসচালক বাস পরিচালনা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সহায়তা নিতে পারবেন। প্রয়োজন হলে পুলিশের সহায়তাও চাওয়া যাবে।
সিঙ্গাপুরের স্থল পরিবহন কর্তৃপক্ষ বলেছে, গণপরিবহন সবার জন্য একটি যৌথ পরিসর। সেখানে প্রত্যেক যাত্রীরই অন্যদের প্রতি দায়িত্বশীল ও বিবেচনাপ্রসূত আচরণ করা উচিত। নতুন নিয়মের পাশাপাশি কর্তৃপক্ষ ও গণপরিবহন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যাত্রীদের সচেতন করতে কাজ চালিয়ে যাবে।
বিশ্বের আরও কয়েকটি শহরেও গণপরিবহনে বিরক্তিকর আচরণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পোল্যান্ডের ক্রাকোভ শহরে চলতি বছরের শুরুতে একই ধরনের নিয়ম চালু করা হয়েছে। সেখানে মোবাইল ফোন বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্র ব্যবহার করে যানবাহনের ভেতরে শান্তি ও নীরবতা নষ্ট করলে সর্বোচ্চ ২০০ জ্লোটি জরিমানা হতে পারে।
যুক্তরাজ্যেও ট্রেন ও স্টেশনে অসামাজিক আচরণের বিরুদ্ধে আইন রয়েছে। অনুমতি ছাড়া এমন কোনো শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্র ব্যবহার করা নিষিদ্ধ, যা অন্যদের বিরক্ত করে। দেশটির কিছু রাজনীতিক বাসসহ সব ধরনের গণপরিবহনে উচ্চ শব্দে গান বা ভিডিও চালানোর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট জরিমানার প্রস্তাবও দিয়েছেন।
সিঙ্গাপুরের নতুন বিধিমালার মাধ্যমে বাসযাত্রীদের দৈনন্দিন আচরণের কয়েকটি বিষয় এখন আইনগতভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, এর লক্ষ্য শুধু জরিমানা আদায় নয়; বরং গণপরিবহনে যাত্রীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতার পরিবেশ তৈরি করা।
সূত্র: বিবিসি