মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে আপত্তিকর ফেসবুক পোস্ট শেয়ার করার অভিযোগে সৌদি আরবের আদালতে মৃত্যুদণ্ডের মুখে পড়েছেন শ্রীলঙ্কার এক তামিল যুবক। শিবারাসা অনোজন নামের ওই যুবক মাত্র নয় মাস আগে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। শ্রীলঙ্কার নারপিট্টিমুনাই এলাকার বাসিন্দা এই যুবকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সূত্রপাত হয় মূলত শ্রীলঙ্কার একটি অনলাইনভিত্তিক ধর্মীয় বিতর্কের জেরে।
অভিযোগ রয়েছে, অনোজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে পবিত্র কাবা শরিফকে একটি মন্দির হিসেবে ফুটিয়ে তোলা একটি ছবি শেয়ার করেছিলেন এবং মহানবী (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য প্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তীতে অত্যন্ত সংবেদনশীল ওই পোস্টটি আরবি ভাষায় অনুবাদ করে সরাসরি সৌদি আরবের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পাঠানো হয়।
জানা যায়, শ্রীলঙ্কার কাতারাগামায় হিন্দু তীর্থযাত্রার সময় তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে থাকা একটি কুকুরকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হিন্দু ও মুসলিম ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। আর সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই ওই মন্তব্যের ঘটনা ঘটেছিল। আদালতে শুনানিকালে অনোজন আত্মপক্ষ সমর্থন করে জানান যে, তিনি পোস্টটি প্রকাশের মাত্র দশ মিনিটের মধ্যেই নিজ দায়িত্বে তা মুছে ফেলেছিলেন। তাঁর নিয়োজিত আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করে জানান যে, সামাজিক মাধ্যমের উত্তপ্ত বিতর্কের জেরে আবেগের বশে ওই মন্তব্য চলে এসেছিল এবং ইসলাম ধর্ম কিংবা মহানবী (সা.)-কে অবমাননা করার বিন্দুমাত্র কোনো দুর্ভিসন্ধি তাঁর ছিল না।
প্রাথমিক বিচারিক প্রক্রিয়ায় সৌদি আরবের আল–আহসা ফৌজদারি আদালত সাইবার অপরাধবিরোধী কঠোর আইনের আওতায় অনোজনকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ত্রিশ লাখ সৌদি রিয়াল অর্থদণ্ড প্রদান করেছিলেন। কিন্তু এই রায়ের বিরুদ্ধে অনোজন উচ্চ আদালতে আপিল করেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলিরাও শরিয়াহ আইনের আওতায় আরও কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়ে আপিল দায়ের করেন। পরবর্তীতে আদালত রাষ্ট্রপক্ষের আপিল মঞ্জুর করায় তাঁর প্রাথমিক সাজা বাড়িয়ে সরাসরি মৃত্যুদণ্ডে উন্নীত করা হয়।
এই চরম সংকটময় পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিথা হেরাথ দেশটির পার্লামেন্টকে জানিয়েছেন যে, উপস্পিকারের নেতৃত্বে একটি বিশেষ প্রতিনিধিদল খুব শীঘ্রই সৌদি আরব সফর করবে। ওই প্রতিনিধিদলটি শ্রীলঙ্কার মহামান্য রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে সৌদি বাদশাহর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমার আবেদনপত্র পেশ করবেন। এছাড়া সৌদি আরবে অনোজনের আইনি লড়াই পরিচালনার সমস্ত ব্যয়ভার রাষ্ট্র বহন করবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এমনকি ইতিপূর্বে অনোজনের পরিবার যে অর্থ খরচ করেছে, সরকার তাও ফেরত দেবে।
শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রিয়াদে অবস্থিত দেশটির দূতাবাসের মাধ্যমে পুরো আইনি প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিক কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকে তাঁর সচিবালয়ে অনেম্বরের হৃতচেতন বাবা–মায়ের সঙ্গে স্বয়ং সাক্ষাৎ করে তাঁদের সান্ত্বনা দিয়েছেন। তিনি পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করেছেন যে, অনোজনকে আইনি উপায়ে রক্ষা করতে এবং ক্ষমা পাওয়ার উপযোগী করতে সরকার সর্বাত্মক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাবে। এই আইনি লড়াইয়ে সহায়তার জন্য বিশিষ্ট আইনজীবী প্রেসিডেন্টস কাউন্সেল উপুল কুমারাপেরুমা ও ফাইজার মুস্তাফা আইনি সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছেন।
এদিকে শ্রীলঙ্কার পাঁচটি শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম সংগঠন যৌথভাবে সৌদি নেতৃত্বের প্রতি মানবিক কারণে অনোজনকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করার জন্য বিশেষ আহ্বান জানিয়েছে। ফ্রি মিডিয়া মুভমেন্ট, সাউথ এশিয়ান উইমেন ইন মিডিয়া, শ্রীলঙ্কা ওয়ার্কিং জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন, তামিল মিডিয়া অ্যালায়েন্স এবং শ্রীলঙ্কা মুসলিম মিডিয়া ফোরামের যৌথ বিবৃতিতে সৌদি বিচার ব্যবস্থার প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি সম্পূর্ণ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই যুবকের প্রাণভিক্ষা চাওয়া হয়েছে। (সূত্র: মুসলিম মিরর)