মাদ্রাসায় হাফেজি পড়া শুরু করলেও জীবন সংগ্রামের তাগিদে শেষ পর্যন্ত বেছে নিয়েছিলেন রাজমিস্ত্রির সহকারীর কাজ। জীবিকার চাকা ঘোরাতে একসময় শহরের রাস্তায় রিকশাও চালিয়েছেন নাটোরের লালপুরের ওহিদুল মোল্লা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস কিংবা শর্টকাটে ধনী হওয়ার নেশায় সেই রিকশাচালকই মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে হয়ে ওঠেন এলাকার ত্রাস ও দুর্ধর্ষ ‘হ্যাকিং গুরু’। সাইবার অপরাধ আর মাদকের কারবার করে অল্প দিনেই অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুললেও শেষ রক্ষা হয়নি; শেষ পর্যন্ত ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরার নিরাপত্তা ভেদ করে পুলিশি জালে ধরা পড়তে হয়েছে তাঁকে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওহিদুল নাটোরের লালপুর উপজেলার বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের মোহরকয়া গ্রামের প্রয়াত রব্বেল মোল্লার ছেলে। তাঁর বাবা কৃষিকাজ করতেন। বাবার মৃত্যুর পর শৈশবে স্থানীয় মাদ্রাসায় পড়াশোনা শুরু করলেও তা বেশিদূর এগোয়নি। এরপর রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ ছেড়ে তিনি রিকশা চালানো শুরু করেন। তবে এলাকার কিছু সাইবার অপরাধীর সংস্পর্শে আসার পরই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। প্রায় পাঁচ বছর আগে রিকশা ছেড়ে পুরোদমে সাইবার হ্যাকিং ও অবৈধ কার্যক্রম শুরু করেন তিনি। অল্পদিনের মধ্যেই হ্যাকিংয়ের বিভিন্ন কলাকৌশল আয়ত্ত করে তিনি হয়ে ওঠেন চক্রের মূল হোতা।
অবৈধ উপায়ে কোটি কোটি টাকা কামানোর পর ওহিদুলের জীবনযাত্রায় আসে বিলাসবহুল পরিবর্তন। গ্রামের আদি বাড়িতে না থেকে তিনি পদ্মা নদীর ধারে আলিশান পাকা বাড়ি নির্মাণ করেন। তাঁর বিশাল খামারে লাখ টাকা মূল্যের দামি কবুতর ও মহিষের খামার ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে এবং নিজের অপরাধ সাম্রাজ্য নিরাপদ রাখতে তিনি অভিনব এক কৌশল নেন। গ্রামের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে নিজের বাড়ির চারপাশ পর্যন্ত মোট ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়ে পুরো এলাকার ওপর নিজস্ব নজরদারি চালাতেন। প্রতিবেশীরা এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কবুতর চোর ঠেকানোর অজুহাত দিতেন। এ ছাড়া বিলাসবহুল গাড়ি চড়ে পাবনা ও রাজশাহীতে যাতায়াত করতেন এবং হোটেল কর্মচারীদের বড় অঙ্কের বকশিশ দিয়ে এলাকায় নিজের প্রভাব দেখাতেন।
লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম জানান, ওহিদুল এলাকায় ‘হ্যাকিং গুরু’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আরও অনেকেই এই অপরাধমূলক চক্রে জড়িয়ে পড়েছিল। গ্রেপ্তারের সময় তাঁর কাছ থেকে ৬৮টি সিম কার্ড জব্দ করা হয়, যা ৭টি ভিন্ন মুঠোফোনে অদলবদল করে হ্যাকিংয়ের কাজে ব্যবহার করা হতো। পুলিশি নজরদারি এড়াতে যত নিরাপত্তাই বা হোক না কেন, অপরাধ করে যে কেউ শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাবে না—ওহিদুলের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে সেটিই প্রমাণিত হলো। বর্তমানে তাঁকে কারাগারে পাঠিয়ে এ চক্রের বাকি সদস্যদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।