ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর প্রতিবেশী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার সম্পর্কে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। দুই দেশের চলমান বাণিজ্য যুদ্ধ এবং ভূরাজনৈতিক নানা জটিলতার মধ্যে এবার চরম খারাপ পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি ও পরিণতি হিসাব করতে শুরু করেছে ওটোয়া। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই আশঙ্কার কথা জানান। গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের মতো চরম পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। তবে এমন অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি যদি সত্যিই তৈরি হয়, তবে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত মারাত্মক ও ভয়াবহ।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সাবেক প্রধান মার্ক কার্নির মতে, এটি মূলত একধরনের ‘ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা’ বা রিস্ক ম্যানেজমেন্ট। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী পরাশক্তির সঙ্গে সম্ভাব্য চরম উত্তেজনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা না করাটা সরকারের দিক থেকে অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীনতা হবে বলে তিনি মনে করেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, কার্নির এই বক্তব্যে যুদ্ধ আসন্ন—এমন কোনো সরাসরি বার্তা না থাকলেও দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি কতটা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা ও কানাডার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্কে ফাটল ধরার মূল কারণ হলো বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের আগ্রাসী বাণিজ্য নীতি এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের লাগাতার ও বিতর্কিত মন্তব্য। ২০২৫ সালে ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই কানাডা ও মেক্সিকো থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। পরবর্তীতে ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্সকে কেন্দ্র করে শুল্ক আরও বাড়ানোর হুমকি দিলে কানাডা সেই কর প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। গত আগস্টে দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য আলোচনা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে যাওয়ার পর উভয় দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি কঠোর শুল্ক আরোপ শুরু করে। ট্রাম্প কানাডার দুই হাজার কোটি ডলারের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ কর ধার্য করলে জবাবে কানাডাও মার্কিন পণ্যে সমপরিমাণ শুল্ক আরোপ করে।
কানাডার মূল সংকট হলো তাদের অর্থনীতি মার্কিন বাজারের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে কানাডার মোট ৫৫ হাজার কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানির প্রায় ৭২ শতাংশই গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। এই অর্থনৈতিক দুর্বলতার পূর্ণ সুযোগ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এমনকি সম্প্রতি দুই দেশের সীমান্তে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘লেক অন্টারিও’র নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ রাখার ঘোষণা দেন তিনি।
এমন বৈরী পরিস্থিতিতে মার্কিন নির্ভরতা কমাতে বহুমুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে মার্ক কার্নির সরকার। এরই অংশ হিসেবে কানাডা মার্কিন পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ কেনার পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করছে এবং স্পেসএক্সের স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবার ওপর থেকে নির্ভরতা কমানোর কাজ শুরু করেছে। গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক টাই সলোমনের মতে, কাগজে-কলমে মার্কিন সামরিক বাহিনী কানাডার চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী হলেও, এমন কোনো সংঘাত বিশ্বজুড়ে মার্কিন স্বার্থের জন্য অপূরণীয় বিপর্যয় ডেকে আনবে এবং অন্যান্য পশ্চিমা মিত্ররাও তখন মার্কিন নিরাপত্তা বলয় থেকে বেরিয়ে নতুন জোট গঠনে বাধ্য হবে।
সূত্র: আল জাজিরা