হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তেহরান ইস্যু প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে ইরানকে কোনো ধরনের সামরিক, গোয়েন্দা বা প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা থেকে বিরত থাকতে বেইজিংকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এই শীর্ষ বৈঠকের মূল বিষয়বস্তু তুলে ধরে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চীনে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড পারডিউ এসব তথ্য জানিয়েছেন।
সিএনবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড পারডিউ জানান, বিশ্বমঞ্চে দুই পরাশক্তির মধ্যকার সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করলেও মধ্যপ্রাচ্য ও তেহরান সংকটের প্রশ্নে ট্রাম্প প্রশাসন বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে নারাজ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও চীনা প্রেসিডেন্টের মধ্যকার এই আলোচনা অত্যন্ত খোলামেলা ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় হয়েছে উল্লেখ করে পারডিউ বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগেই বেইজিংকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে গোয়েন্দা তথ্য, যন্ত্রাংশ কিংবা যেকোনো সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে ইরানকে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। হোয়াইট হাউসের এই বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিষয়টি আবারও চীনা প্রেসিডেন্টের সামনে খুব জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছেন।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় পর্যায়ের কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ কার্যকর করার এবং বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে তেহরানের অবশিষ্ট বাণিজ্যিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জোর প্রচেষ্টা চলছে। তবে ইরানের দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদার চীন যদি এই অবরোধ বাস্তবায়নে ওয়াশিংটনকে সহযোগিতা না করে, তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা সংশয় রয়েছে। এদিকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক বৈঠকে দুই শীর্ষ নেতা এই মর্মে একমত হয়েছেন যে কোনো অবস্থাতেই ইরানকে পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হতে দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত রাখতে এবং ওই জলপথে কোনো অননুমোদিত টোল আদায়ের সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না বলেও আলোচনা হয়েছে।
তবে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে তেহরানকে বিভিন্ন উপায়ে পরোক্ষ সহায়তার অভিযোগ নিয়ে ওয়াশিংটনের গভীর উদ্বেগ এখনো কাটেনি। এর আগে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, মহাকাশভিত্তিক স্যাটেলাইট চিত্র, স্পর্শকাতর গোয়েন্দা তথ্য এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের নির্দেশনা ব্যবস্থা তৈরির ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে তেহরানকে সামরিকভাবে শক্তিশালী হতে সহায়তা করছে চীন। এমনকি চলতি বছরের মে মাসে মার্কিন প্রশাসন চীনা স্যাটেলাইট চিত্র সরবরাহকারী তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বেইজিংয়ের ওপর কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাপ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া বহুমুখী সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক দুই পরাশক্তির এই বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। যদিও তাইওয়ান বা অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো থেকে ইরান ইস্যুকে সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বতন্ত্র হিসেবে দেখছে ওয়াশিংটন। রাষ্ট্রদূত পারডিউ জানিয়েছেন, তেহরানের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের গোপনীয় কূটনৈতিক যোগাযোগ ও ব্যক্তিগত আলোচনা এখনও অব্যাহত রয়েছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের কঠোর অবস্থানের কারণে বৈশ্বিক রাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছে।
সূত্র: সিএনবিসি, সিএনএন ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল