দেশের জনস্বাস্থ্য খাতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি দিন দিন আরও উদ্বেগজনক ও আতঙ্কজনক রূপ ধারণ করছে। এডিস মশাবাহিত এই প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে আরও তিন জন রোগীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন আরও ১ হাজার ৪৩২ জন ডেঙ্গুরোগী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত ডেঙ্গু সংক্রমণের সার্বিক চিত্র অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কেবল এই বছরই মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে প্রাণ হারিয়েছেন মোট ২১৪ জন মানুষ। একই সঙ্গে এই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হওয়ার জন্য ভর্তি হয়েছেন মোট ৭১ হাজার ৫৩৬ জন রোগী। বর্ষা মৌসুমের দীর্ঘস্থায়িত্ব, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর মশকনিধনের অভাবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এডিসের উপদ্রব কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে মৃত্যুবরণকারী তিন জনের ভৌগোলিক ও লিঙ্গভিত্তিক পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে দুজন ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলার এবং একজন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার স্থায়ী বা সাময়িক বাসিন্দা। মারা যাওয়া এই তিন ব্যক্তির মধ্যে দুজন পুরুষ এবং একজন নারী রয়েছেন। চিকিৎসকরা বারবার সতর্ক করে আসছেন যে, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা না করে দ্রুত রক্ত পরীক্ষা করানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা অত্যন্ত জটিল ও অবনতিশীল অবস্থায় হাসপাতালে আসায় তাদের জীবন রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন ডেঙ্গুরোগী ভর্তির হার ব্যাপকহারে অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগে ২০৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২০৯ জন এবং ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় (সিটি করপোরেশনের বাইরে) সর্বোচ্চ ২৮০ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১০৬ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৭০ জন রোগী চিকিৎসাধীন হয়েছেন।
অন্যদিকে ঢাকার বাইরে অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে খুলনা বিভাগে ২৪১ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১১২ জন, রাজশাহী বিভাগে ৫৭ জন এবং রংপুর বিভাগে ৫৩ জন ডেঙ্গুরোগী নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, দাপ্তরিক পরিসংখ্যানে যে হিসাব উঠে আসছে, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা তার চেয়ে বহুগুণ বেশি। কারণ বহু মানুষ উপসর্গকে সাধারণ জ্বর মনে করে চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে ঘরে বসেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। ডেঙ্গুর এই ভয়াবহ বিস্তার রোধে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমন্বিত ও কঠোর মশকনিধন অভিযান পরিচালনার জোরালো দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।