মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নির্মম নির্যাতনে বাস্তুচ্যুত ও নিপীড়িত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত বর্বরোচিত গণহত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) চলমান ঐতিহাসিক মামলার চূড়ান্ত রায় খুব শীঘ্রই ঘোষণা হতে পারে। বিশ্বজুড়ে বহুল আলোচিত এই মামলার চূড়ান্ত রায় আগামী মাসেই প্রকাশিত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারমন্ত্রী দাউদা এ জালো। দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং বিশ্ববাসীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এই রায়ের মধ্য দিয়ে নির্যাতিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী তাদের কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে একধাপ সুদৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা।
রোহিঙ্গা সংকটের আইনি লড়াইয়ের সূচনা হয়েছিল ২০১৯ সালে। আফ্রিকার মুসলিমপ্রধান স্বাধীন দেশ গাম্বিয়া নিজ উদ্যোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) এই যুগান্তকারী মামলাটি দায়ের করে। ওআইসি বা ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক, নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থনে পরিচালিত এই ঐতিহাসিক মামলায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘ গণহত্যা সনদের গুরুতর বিধান লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার মূল বিবরণীতে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরা হয়েছিল যে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, বিভীষিকাময় সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং নির্বিচারে বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে প্রায় সাত লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি অসহায় রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত এই লোমহর্ষক অপরাধের প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং মূল বিচার প্রক্রিয়ার পূর্বেই প্রয়োজনীয় অন্তর্বর্তীকালীন আইনি সুরক্ষা ও জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গাম্বিয়ার পক্ষ থেকে আইসিজে-র কাছে বিশেষ আবেদন জানানো হয়েছিল। নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক আদালতের স্থায়ী এজলাসে উভয় পক্ষের প্রথিতযশা আইনজীবীদের উপস্থিতিতে এই অভিযোগের ওপর দীর্ঘ ও বিস্তারিত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। অত্যন্ত চাঞ্চল্যকরভাবে, বিশ্বমঞ্চে মিয়ানমারের পক্ষে সরাসরি সাফাই গাইতে এবং দেশটির সামরিক জান্তার নৃশংস অবস্থানকে ধামাচাপা দিতে তৎকালীন নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সু চি হেগের আদালতে সশরীরে উপস্থিত হয়েছিলেন। সে সময় আন্তর্জাতিক শুনানিতে অং সান সু চি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেছিলেন যে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় গণহত্যা বা জাতিগত নিধনের ঘটনা ঘটেনি।
আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারপদ্ধতির সর্বজনস্বীকৃত নিয়ম অনুযায়ী, আইসিজে-র চূড়ান্ত রায় বা সিদ্ধান্তই সর্বময় এবং এর বিরুদ্ধে উচ্চতর কোনো আদালতে আপিল করার বা রায় পুনর্বিবেচনার কোনো সুযোগ থাকে না। ফলে আগামী মাসে ঘোষিত হতে যাওয়া এই ঐতিহাসিক রায় শুধু মিয়ানমার সরকারের অপরাধমূলক জবাবদিহিতাই নিশ্চিত করবে না, বরং বৈশ্বিক মানবাধিকার সুরক্ষার ইতিহাসে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত বা মাইলফলক হিসেবে স্থায়ীভাবে স্থান করে নেবে। দীর্ঘ এই সংকট নিরসনে এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের আইনি ভিত্তি মজবুত করতে এই রায়ের ফল অত্যন্ত দূরবর্তী ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মহল জোরালোভাবে আশা প্রকাশ করছে।