যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তায় নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক ধস নেমেছে। গত প্রায় ছত্রিশ বছরের মধ্যে দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে আর কোনো ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার হার এত নিম্নগামী হয়নি।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংবাদমাধ্যম টাইমস নাউ এবং প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাম্প্রতিক এক জরিপ প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ট্রাম্পের পক্ষে সাধারণ মানুষের সমর্থনের হার বর্তমানে মারাত্মকভাবে কমে মাত্র ৩৭ শতাংশে এসে ঠেকেছে, যেখানে বিশাল সংখ্যক অর্থাৎ প্রায় ৬১ শতাংশ ভোটার সরাসরি তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ১৯৯০ সালের পর থেকে মার্কিন রাজনীতিতে পরিচালিত বিভিন্ন জনমত জরিপের দীর্ঘ ইতিহাসে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের অর্জন করা এটিই সবচেয়ে কম সমর্থনের রেকর্ড হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া প্রায় সাত মাসের দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাত এবং এর সরাসরি প্রভাব হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ট্রাম্পের এই চরম জনপ্রিয়তাহীনতার পেছনে প্রধানত এই বহুমুখী অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সংকটগুলোই গভীরভাবে দায়ী বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। হোয়াইট হাউসে তার দ্বিতীয় দফার কার্যভার গ্রহণের সময়ে সাধারণ ভোটারদের মাঝে তার অনুমোদনের হার সন্তোষজনকভাবে ৪৭ শতাংশ ছিল।
কিন্তু স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স ও ইপসোসের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ২১ সেপ্টেম্বরের সাম্প্রতিক জরিপে তা আরও কমে সর্বনিম্ন ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে। এমনকি সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ক্ষমতার মেয়াদে রেকর্ড করা সর্বনিম্ন ৩৫ শতাংশ অনুমোদনের হার থেকেও বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার সূচক উল্লেখযোগ্যভাবে নিচে অবস্থান করছে।
ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সামরিক পদক্ষেপ এবং আক্রমণাত্মক যুদ্ধনীতির পক্ষে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের সমর্থন নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে মাত্র ৩১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া প্রায় ৮৩ শতাংশ সাধারণ মানুষ গভীর শঙ্কা প্রকাশ করে মত দিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান এই সামরিক সংঘাত কোনোভাবেই সহসা থামছে না, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে আরও বেশি ভয়ানক রূপ নিতে পারে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ভার ও মুদ্রাস্ফীতি সফলভাবে সামলানো এবং জাতীয় অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বের ওপর জনগণের আস্থার মাত্রা ধসে গিয়ে মাত্র ১৭ শতাংশে ঠেকেছে।
নিজ দলের বিক্ষুব্ধ ও হতাশ সমর্থকদের সন্তুষ্ট রাখতে এবং আসন্ন নির্বাচনে তাদের ভোটব্যাংক ধরে রাখতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সংশ্লিষ্ট তেল কোম্পানিগুলোকে চড়া মূল্যের জন্য দায়ী করার পাশাপাশি সংকট উত্তরণে সাধারণ ভোটারদের মাথাপিছু পাঁচ হাজার ডলার পর্যন্ত নগদ ডিভিডেন্ড বা বিশেষ লভ্যাংশ প্রদান করার এক নতুন ও লোভনীয় রাজনৈতিক প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। তবে ভোটারদের আস্থাহীনতা দূর করার এই কৌশল শেষ পর্যন্ত মধ্যবর্তী নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে, তা নিয়ে মার্কিন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে তীব্র সংশয় ও বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
(সূত্র: টাইমস নাউ, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও রয়টার্স)