মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের কালো মেঘ। হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে পারস্য উপসাগরে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার ভূরাজনৈতিক বিরোধ ও সামরিক উত্তেজনা তীব্র থেকে তীব্রতর রূপ ধারণ করেছে। যেকোনো ধরনের অপ্রত্যাশিত সামরিক সংঘাতের মুখোমুখি হতে তেহরান এখন সর্বাত্মক ও পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। আন্তর্জাতিক মহলে কূটনৈতিক সমঝোতা ও সংলাপের নানা চেষ্টা সমান্তরালে চলতে থাকলেও মাঠের বর্তমান বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত ও সংঘাতময় এক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক এই উত্তেজনার মূল ও প্রধান সূত্রপাত হরমুজ প্রণালীর গুরুত্বপূর্ণ জলপথ পুনরায় সচল করার একটি সাত দিনব্যাপী রূপরেখা বা রোডম্যাপ প্রস্তাব নিয়ে। বিশ্ব বাণিজ্যের তেল সরবরাহ ও যোগাযোগের এই অত্যন্ত কৌশলগত ও সংবেদনশীল রুটটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ওয়াশিংটনের কাছে পেশ করা হয়েছিল।
তবে হোয়াইট হাউসের নীতিনির্ধারকরা তাৎক্ষণিকভাবে সেই প্রস্তাব সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেন। এই কূটনৈতিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরই মূলত দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলার পরিবর্তে তা আরও বেশি শীতল, অনমনীয় ও সংঘাতময় হয়ে উঠেছে। তেহরানের শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়ে দিয়েছেন যে, কূটনীতির পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ করে যুক্তরাষ্ট্র যদি একতরফাভাবে বলপ্রয়োগের নীতি বেছে নেয়, তবে তার উপযুক্ত জবাব দিতে একচুলও পিছপা হবে না ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান।
এরই ধারাবাহিকতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমে এক প্রতিক্রিয়ায় ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, চলতি সপ্তাহেই তেহরানের সঙ্গে নতুন করে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী সুরে দাবি করেছেন যে, দুই দেশের মধ্যে কোনো ধরনের রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাত বাধলে যুক্তরাষ্ট্র খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হবে। তবে এই প্রকাশ্য কূটনৈতিক বাগযুদ্ধের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের নানা নাটকীয় ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও রহস্যময় করে তুলেছে।
সম্প্রতি তেহরানের সামরিক সূত্রের পক্ষ থেকে জোরালো দাবি করা হয়েছে যে, হরমুজ প্রণালীর সংবেদনশীল জলসীমা থেকে মার্কিন নৌবাহিনীর অত্যন্ত গোপনীয় ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন একটি পানির নিচের ড্রোন সফলভাবে জব্দ করা হয়েছে। যদিও পেন্টাগন বা মার্কিন সামরিক বাহিনী শুরুতেই এই ড্রোন জব্দের দাবি জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে, তবুও কৌশলগত এই জলপথে সামরিক নজরদারি এবং পারস্পরিক আস্থার অভাব পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে।
অন্যদিকে, আঞ্চলিক নিরাপত্তার বৃহত্তর সমীকরণকে আরও বেশি গোলমেলে করে তুলেছে যুক্তরাজ্যের মাটিতে ঘটে যাওয়া একটি সাম্প্রতিক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা। মধ্যপ্রাচ্যে বা ইরানে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে লজিস্টিক সহায়তা কিংবা যুদ্ধবিমানের লজিস্টিক হাব হিসেবে ব্যবহৃত হয়—এমন একটি ব্রিটিশ বিমানঘাঁটির নিকটবর্তী এলাকা থেকে মোট পাঁচ সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে পরিচালিত এই অভিযানে বিস্ফোরক আইন লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগে তাদের আটক করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা ও পুলিশ কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট নিরসনে পর্দার আড়ালে বা সামনে আলোচনার কিছু অস্পষ্ট ইঙ্গিত মিললেও, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মৌলিক অবস্থান, কৌশলগত লক্ষ্য এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে এখনো আকাশ-পাতাল ফারাক রয়ে গেছে। ফলে যেকোনো মুহূর্তে এই প্রচ্ছন্ন ও শীতল লড়াই একটি পূর্ণাঙ্গ সশস্ত্র আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করছেন আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষক ও বিশ্লেষকরা।