আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালী থেকে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি অত্যাধুনিক সাবমেরিন ড্রোন সফলভাবে জব্দ করার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর নৌবাহিনী গত কাল রবিবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান জ্বালানি সরবরাহ লাইনে চলমান তীব্র সামরিক উত্তেজনা ও ভূরাজনৈতিক বৈরী পরিস্থিতির মাঝেই এই ড্রোন আটকের ঘটনা গোটা অঞ্চলে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছে।
আইআরজিসির প্রকাশিত সুনির্দিষ্ট বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, নিখুঁত গোয়েন্দা নজরদারি এবং উন্নত বৈদ্যুতিক যুদ্ধ বা ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সরঞ্জামের যথাযথ সমন্বয়ে পরিচালিত অত্যন্ত জটিল ও সুপরিকল্পিত একটি অভিযানের মাধ্যমেই এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে। সন্ত্রাসী মার্কিন সামরিক বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত এই সাবমেরিন ড্রোনটি হরমুজ প্রণালীর সুরক্ষিত জলসীমা থেকে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে আইআরজিসির নৌবাহিনীর চৌকস ও পেশাদার সদস্যরা। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশলগত জলপথে বিদেশি শক্তির যেকোনো গোপন সামরিক তৎপরতা বা গোয়েন্দাগিরি প্রতিহত করতে তেহরানের এই কঠোর পদক্ষেপ তাদের অপারেশনাল প্রস্তুতিরই স্পষ্ট প্রমাণ।
বিবৃতিতে আরও বিশদ বিবরণ দিয়ে জানানো হয়েছে যে, জব্দ করা সাবমেরিন ড্রোনটি মূলত একটি ‘রেমুস ৬০০ অটোনোমাস আন্ডারওয়ার ভেহিকেল’। দীর্ঘদিন ধরে এই বিশেষ প্রযুক্তির জলরোধী ড্রোনটি হরমুজ প্রণালীর বিভিন্ন সংবেদনশীল পয়েন্টে গোপন নজরদারি ও নানা ধরনের কৌশলগত তথ্য সংগ্রহের কাজে নিয়মিত ব্যবহার করে আসছিল মার্কিন বাহিনী। বর্তমানে আইআরজিসির নৌবাহিনীর বিশেষজ্ঞ প্রযুক্তিবিদ ও সাইবার বিশেষজ্ঞরা এই ড্রোনটির মেমোরি ও ভেতরের সংরক্ষিত গোপনীয় গোয়েন্দা তথ্য পুনরুদ্ধারের জন্য নিবিড় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর আগে চলতি সেপ্টেম্বর মাসের শুরুর দিকেও আইআরজিসি একই জলপথ থেকে আরেকটি সাবমেরিন ড্রোন সফলভাবে জব্দ করতে সক্ষম হয়েছিল বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্তকারী প্রায় একশো সাতষট্টি কিলোমিটার দীর্ঘ এই হরমুজ প্রণালী বৈশ্বিক জ্বালানি পণ্যের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জ্বালানি পণ্যের প্রায় কুড়ি শতাংশই এই সংকীর্ণ জলপথের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দেশে পরিবাহিত হয়ে থাকে। ফলে এই আন্তর্জাতিক রুটের সামান্যতম অস্থিতিশীলতা বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা বিশ্ববাজারের অর্থনীতিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সশস্ত্র যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই কৌশলগত কারণে এই প্রণালীতে কঠোর সামরিক অবরোধ জারি করে রেখেছে ইরান। সার্বিক যুদ্ধাবস্থা এবং চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে আন্তর্জাতিক এই বাণিজ্য রুটে নিরাপত্তা সংকট দিন দিন আরও বেশি ঘনীভূত হচ্ছে। একদিকে তেহরানের কঠোর সামুদ্রিক পাহারা এবং অন্যদিকে মার্কিন নৌবাহিনীর ধারাবাহিক উপস্থিতি হরমুজ প্রণালীকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করেছে। দুই পক্ষের এই ধারাবাহিক ও তীব্র সংঘাতের জেরে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও স্বাভাবিক বাণিজ্য চলাচল এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।