বর্তমান যুগে প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানবসভ্যতার সামনে যেমন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, তেমনি এর পেটে লুকিয়ে থাকা শঙ্কার মেঘ দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের অভাবনীয় বিস্তার নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষকদের মাঝে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই ধারাবাহিকতায় মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলোকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তার মতে, অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কোনো ব্যক্তি বা চক্রের হাতে যদি সর্বাধুনিক এআই প্রযুক্তি পৌঁছে যায়, তবে তা বিশ্বজুড়ে এক মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এর ভয়াবহ পরিণতিতে প্রায় একশ কোটি মানুষের প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটার শঙ্কা রয়েছে, যা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিল গেটসের এই শঙ্কার সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে আরও বেশ কিছু আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানেও। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্বনামধন্য অ্যালান টিউরিং ইনস্টিটিউট একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই এমন সব সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই ব্যবস্থা আবির্ভূত হতে পারে, যা বুদ্ধিবৃত্তিক বা জ্ঞানগত সমস্ত কাজে মানুষের বর্তমান সক্ষমতাকে বহুগুণ ছাড়িয়ে যাবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি এমন সব জটিল কৌশল নিজেই প্রণয়ন করতে শুরু করে যা মানুষ বা সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়, তবে মানবজাতি এই প্রযুক্তির ওপর থেকে নিজেদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ চিরতরে হারিয়ে ফেলবে। শুধু তাই নয়, রাসায়নিক ও জৈবিক অস্ত্রের ধ্বংসাত্মক ব্যবহারের মতো ভয়ংকর তথ্যও উঠে এসেছে ওই প্রতিবেদনে, যা কেবল আমাদের গণতান্ত্রিক কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতাকেই মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলছে না, বরং সমগ্র মানবসভ্যতাকে একটি চরম অনিশ্চিত ও ধ্বংসাত্মক ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রযুক্তির এই লাগামহীন বিস্তার ও সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়াতে বিশ্বের নীতি নির্ধারক ও প্রযুক্তিবিদরা এখন নানা প্রস্তাব সামনে আনছেন। মার্কিন শীর্ষস্থানীয় এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই ফ্রন্টিয়ার এআইয়ের উন্নয়নে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সাময়িক বিরতি দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, অভিন্ন ও কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড নির্ধারণ এবং চীনের মতো দেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরের জোরালো প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। একই সুর শোনা গেছে এ খাতের অন্য গবেষকদের কণ্ঠেও।
অ্যানথ্রপিকের সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সন এবং অ্যালাইনমেন্ট সায়েন্সের প্রধান ইভান হাবিঙ্গার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, চলতি দশকের শেষ প্রান্তিক বা আগামী এক দশকের মধ্যেই এআই প্রযুক্তির কারণে মানবজাতি এক গভীর খাদের মুখে পড়তে পারে। তাদের মতে, এই বিপর্যয়ের ঘটার আশঙ্কা সাধারণ কোনো হিসাব নয়, বরং এর সম্ভাবনা দশ শতাংশের চেয়েও অনেক বেশি।
এমতাবস্থায় এআইয়ের মতো দানবীয় শক্তির লাগাম টেনে ধরতে সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে অবিলম্বে আন্তর্জাতিক ফোরামে আলোচনায় বসার তাগিদ দিয়েছেন বিল গেটস। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তিটির ওপর কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হলে এর সামগ্রিক গবেষণার গতি থমকে যাবে না, অথচ বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় অবলীলায় এড়ানো সম্ভব হবে। সময়ের কাঁটা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বারবার যে বিপদের ঘণ্টা বাজাচ্ছেন, তা আমলে না নিলে মানবসভ্যতাকে এর চড়া মূল্য চুকাতে হতে পারে। তাই বিশ্বনেতৃত্বকে এখনই একযোগে কাজ শুরু করতে হবে যাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবকল্যাণের পরিবর্তে ধ্বংসের হাতিয়ারে পরিণত না হয়।
সূত্র: এনডিটিভি