ফিলিস্তিনের রামাল্লায় অবস্থিত নেদারল্যান্ডস মিশনের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর কূটনৈতিক মর্যাদা বা স্ট্যাটাস হঠাৎ করেই বাতিল করে দিয়েছে ইসরায়েল। এই আকস্মিক ও কঠোর সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে দ্য হেগ অবস্থিত ডাচ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছে দেশটিতে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে। দখলকৃত পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতি থেকে পণ্য আমদানির ওপর ডাচ সরকার সম্প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার ঠিক পরপরই ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এই পাল্টা কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হলো, যা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন এক উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
ডাচ পাবলিক ব্রডকাস্টার এনওএস (NOS)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডাচ পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম বারেন্ডসেন দ্য হেগে সফররত জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুলকে সঙ্গে নিয়ে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ইসরায়েলের এই একতরফা ও আকস্মিক সিদ্ধান্তের ফলে নেদারল্যান্ডসের রামাল্লা মিশনের যে সমস্ত ডাচ কর্মীর কূটনৈতিক মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের আগামী সাত দিনের মধ্যে ইসরায়েল ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই অযৌক্তিক আদেশ ডাচ কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
মূল ঘটনার পটভূমি ব্যাখ্যা করে জানা যায়, এর আগে দখলকৃত পশ্চিম তীর এবং কৌশলগত গোলান মালভূমির ইসরায়েলি অবৈধ বসতিগুলোতে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিল নেদারল্যান্ডস সরকার। তেল আবিবের অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের নীতির বিরুদ্ধে ডাচ প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থানের পরই মূলত ইসরায়েল সরকার এই প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ডাচ পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম বারেন্ডসেন ইসরায়েলের এই পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত কারণ, বিস্তারিত প্রেক্ষাপট এবং এর সুদূরপ্রসারী পরিণতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়ার জন্যই মূলত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়েছে।
ডাচ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলবকৃত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত জভি অভিনের ভাপনিকে মঙ্গলবার মন্ত্রণালয়ে উপস্থিত হয়ে এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক জবাব দেওয়ার কথা রয়েছে। ডাচ সংবাদমাধ্যম এনওএস-এর তথ্যমতে, বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম বারেন্ডসেনের আমলে ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে তলব করার এটিই প্রথম ঘটনা নয়। এর আগে চলতি বছরের মে মাসেও গাজামুখী একটি ত্রাণবাহী জাহাজে (ফ্লোটিলা) ইসরায়েলি কমান্ডোদের কড়াকড়ি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে একই রাষ্ট্রদূতের মুখোমুখি হতে হয়েছিল ডাচ পররাষ্ট্র দফতরকে। সে সময় ডাচ কর্মীরা ওই ফ্লোটিলার বিভিন্ন অধিকারকর্মী ও মানবাধিকারকর্মীদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর অবমাননাকর আচরণের কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নেদারল্যান্ডস ও ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্কের এই টানাপোড়েন ইউরোপীয় রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফিলিস্তিন সংকট ও পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতি স্থাপনকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের অবনতি বিগত দিনে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ডাচ সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের প্রশ্নে ডাচ কূটনীতি কোনো ধরনের আপস করবে না এবং কূটনৈতিক কর্মীদের ওপর ইসরায়েলের এই অযাচিত চাপ সৃষ্টির জবাব যথাযথ কূটনৈতিক মাধ্যমেই দেওয়া হবে। এখন সমগ্র ইউরোপীয় কূটনৈতিক মহলের নজর রয়েছে দ্য হেগে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সেই বিশেষ বৈঠকের ফলাফলের দিকে, যেখানে নির্ধারিত হবে দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রূপরেখা।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি , হালিস সুনেতসি (বিদেশি সংবাদমাধ্যম)