দখলকৃত পশ্চিম তীরের প্রাণকেন্দ্র রামাল্লা ও আল-বিরেহ শহরের চারপাশের চেকপোস্টগুলোতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কঠোর অবরোধ ও কড়াকড়ির কারণে চরম মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে যাতায়াত, কর্মসংস্থান ও জরুরি চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নাগরিক দীর্ঘ সময় ধরে সড়কে আটকা পড়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতকে এক অন্তহীন দুর্ভোগে পরিণত করেছে এই হঠাৎ চাপানো সামরিক বিধিনিষেধ।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আতারো, আইন সিনিয়া, জাবাসহ প্রধান প্রধান চেকপোস্টগুলোতে শত শত গাড়ির দীর্ঘ লাইন তৈরি হতে দেখা গেছে। আতারো চেকপোস্টে দীর্ঘ সময় আটকে থাকা মালিক আনাস নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা আনাদোলু এজেন্সিকে জানান, তিনি রামাল্লা থেকে নিজ শহর ক্বালকিলিয়ায় ফেরার পথে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। ইসরায়েলি বাহিনী মধ্যরাতের পর চেকপোস্ট খুলে দেওয়ার আগে তাকে প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্যে গাড়িতেই অপেক্ষা করতে হয়। একইভাবে অন্যান্য যাত্রীরাও দীর্ঘ পথ ঘুরে ও তীব্র ভোগান্তি পেরিয়ে গভীর রাতে কিংবা রাত প্রায় দুইটার দিকে নিজ গৃহে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
এই কঠোর সামরিক বিধিনিষেধের কারণে কেবল সাধারণ যাতায়াতই নয়, বরং জরুরি চিকিৎসাসেবা পাওয়ার পথও সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফিলিস্তিনি মানবাধিকারকর্মী আয়েদ গাফারি আতারো চেকপোস্টে একটি মর্মান্তিক ঘটনার কথা উল্লেখ করে জানান, চেকপোস্ট পার হতে না পেরে মুমূর্ষু এক রোগীকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে অ্যাম্বুলেন্সে স্থানান্তর করতে বাধ্য হন স্বজনরা। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দখলদার বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে সুপরিকল্পিতভাবে রামাল্লার প্রবেশপথগুলো আটকে রাখছে এবং সাধারণ নাগরিকদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে, যা তাদের জীবনযাত্রাকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ফিলিস্তিনিদের মতে, ইহুদিদের বিভিন্ন ছুটির দিনকে কেন্দ্র করে এই কড়াকড়ি আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যদিও ইসরায়েল বরাবরের মতো এটিকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার অজুহাত হিসেবে দাঁড়কাচ্ছে।
ফিলিস্তিনি সরকারি বার্তা সংস্থা ওয়াফা সূত্রে জানা গেছে, আতারো ও আইন সিনিয়া ছাড়াও আবুদ, নবী সালেহ, ইয়াব্রুদ এবং জাবার প্রবেশপথগুলোতেও কঠোর অবরোধ বজায় রাখা হয়েছে। ফিলিস্তিনি কলোনাইজেশন অ্যান্ড ওয়াল রেজিস্ট্যান্স কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রামাল্লা ও আল-বিরেহ গভর্নরেট জুড়েই রয়েছে ১৬০টি স্থায়ী চেকপোস্ট ও যাতায়াত বন্ধের পয়েন্ট, যা হেব্রনের ২২১টির পর পশ্চিম তীরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যা। সমগ্র দখলকৃত পশ্চিম তীর জুড়ে এ ধরনের প্রায় ৯৪২টি চেকপোস্ট, ব্যারিকেড ও চলাচলের বাধা চিহ্নিত করা হয়েছে। জাতিসংঘ মানবিক সহায়তা সমন্বয় দফতর (ওসিএইচএ) সতর্ক করে বলেছে যে, এ ধরনের সামরিক বাধা ফিলিস্তিনিদের ঘুরতি ও দীর্ঘ পথ ব্যবহারে বাধ্য করে, যার ফলে কর্মক্ষেত্র, স্কুল, হাসপাতাল এবং অন্যান্য অতি জরুরি সেবা পাওয়ার অধিকার মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, রামাল্লা ও এর আশপাশের জনবহুল অঞ্চলগুলোতে এই ধরনের নজিরবিহীন সামরিক কড়াকড়ি কেবল সাধারণ মানুষের চলাচলের স্বাধীনতাই কেড়ে নিচ্ছে না, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও সামাজিক ভিত্তিকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে। অতীতেও বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব বা ছুটির সময় এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নজির রয়েছে, তবে এবারের মাত্রা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র।
রাজধানী বা প্রধান শহরগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ফলে শিক্ষার্থীরা সময়মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে পারছে না, ব্যবসায়ীরা তাদের পেশাগত কার্যক্রম চালাতে গিয়ে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন এবং রোগীরা সঠিক সময়ে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে ফিলিস্তিনিদের অবাধ চলাচলের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানালেও ইসরায়েলি সামরিক কর্তৃপক্ষ তাদের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসেনি। ফলে রামাল্লা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার সাধারণ ফিলিস্তিনিরা এক প্রকার অবরুদ্ধ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি