ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের চারপাশের সামুদ্রিক এলাকায় বিতর্কিত 'সি লায়ন' তেল প্রকল্প চালুর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে আর্জেন্টিনা। দ্বীপটির প্রাকৃতিক সম্পদের অবৈধ ও বেআইনি শোষণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সালিশি বা আরবিট্রেশন শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। ফকল্যান্ড বা মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জের ওপর নিজেদের ঐতিহাসিক ও অখণ্ড সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষে বুয়েনস আইরিস কঠোর কূটনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপের পথে হাঁটছে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।
সোমবার মার্কিন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ দেওয়া এক জোরালো ও আক্রমণাত্মক বার্তায় আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই বলেন, “উত্তর ফকল্যান্ড বেসিনে ‘সি লায়ন প্রজেক্ট’-এর মাধ্যমে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ অবৈধভাবে লুটের অপচেষ্টা চালাচ্ছে যুক্তরাজ্য। এই বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে সালিশি কার্যক্রম শুরু করতে আমি দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আমাদের আইনি টিমকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছি।”
লন্ডন যদি এই তেল উত্তোলনের বিতর্কিত প্রকল্প অবিলম্বে বন্ধ না করে, তবে বিষয়টি আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ট্রাইব্যুনালের (International Tribunal for the Law of the Sea) দরবারে নিয়ে যাওয়ার কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট। এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে তিনি হুঁশিয়ার করে বলেন, “আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে যদি যুক্তরাজ্য এই অবৈধ শোষণ বন্ধ না করে, তবে আমরা সরাসরি আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ট্রাইব্যুনালে যাব।” দ্বীপপুঞ্জের ওপর আর্জেন্টিনার সার্বভৌমত্বের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে তিনি আরও যোগ করেন, “ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ সম্পূর্ণভাবে আর্জেন্টিনার এবং এটি কেবল কথায় নয়, বরং বাস্তব পদক্ষেপ ও আত্মরক্ষার মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হবে।”
আর্জেন্টিনার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দ্বীপপুঞ্জের আশপাশের সামুদ্রিক এলাকায় প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ ও তেল-গ্যাস উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত যেকোনো কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তাদের আইনি ও কূটনৈতিক প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে। বুয়েনস আইরিস মনে করে, যেহেতু এই ভূখণ্ড এবং এর পার্শ্ববর্তী জলসীমার ওপর আর্জেন্টিনার অবিসংবাদিত সার্বভৌমত্ব রয়েছে, সেহেতু সেখানে যেকোনো ধরনের হাইড্রোকার্বন কার্যক্রম সম্পূর্ণ অননুমোদিত ও বেআইনি।
সম্প্রতি দ্বীপপুঞ্জের চারপাশের অফশোর হাইড্রোকার্বন লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়ানোর প্রতিবাদে বুয়েনস আইরিসে অবস্থিত ব্রিটিশ দূতাবাসের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদলিপি জমা দিয়েছে আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এছাড়া, আলোচিত পিএল০০১ (PL001) ব্লকে ‘নেভিটাস পেট্রোলিয়াম আটলান্টিক লিমিটেড’ (Navitas Petroleum Atlantic Limited)-এর অংশীদারিত্ব অর্জনের সরকারি অনুমোদন নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর পরিকল্পনা অনুযায়ী, উত্তর ফকল্যান্ড বেসিনে একটি অফশোর তেলক্ষেত্র গড়ে তোলার কাজ চলছে এবং সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৮ সালের মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার এই ঐতিহাসিক বিরোধ দীর্ঘদিনের। ১৮৩৩ সাল থেকে দ্বীপগুলো ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এই ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ১৯৮২ সালে দুই দেশের মধ্যে ৭৪ দিনব্যাপী একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধও সংঘটিত হয়েছিল। আর্জেন্টিনা বরাবরই আন্তর্জাতিক ফোরামে এই দ্বীপপুঞ্জের ওপর নিজেদের অবিসংবাদিত সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে, পক্ষান্তরে যুক্তরাজ্য কঠোর অবস্থানে থেকে বলে আসছে যে দ্বীপগুলো তাদের সার্বভৌম ভূখণ্ড হিসেবেই গণ্য হবে।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই ইস্যুতে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও সোচ্চার ভূমিকা পালন করে চলেছেন। তিনি একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক আইনি লড়াই ও কূটনৈতিক উপায়ে আর্জেন্টিনার সার্বভৌমত্বের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরছেন, অন্যদিকে দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে পরোক্ষভাবে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক বজায় রাখার ভিন্নমুখী কৌশলও গ্রহণ করেছেন। তবে নতুন করে শুরু হওয়া এই তেল উত্তোলনের পরিকল্পনা ও আইনি হুশিয়ারির ফলে দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সুপ্ত উত্তেজনা এখন নতুন মোড় নিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি