মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক দীর্ঘ ও সংঘাতপূর্ণ অধ্যায়ের যবনিকা টেনে অবশেষে ইরাক থেকে নিজেদের সমস্ত সামরিক বাহিনী পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল দেশটিতে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি ও প্রভাব বজায় রাখার পর আজ বুধবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঐতিহাসিক সেনা প্রস্থান প্রক্রিয়া চূড়ান্ত রূপ লাভ করতে যাচ্ছে। যদিও তেহরান এবং তার আঞ্চলিক মিত্ররা মার্কিন বাহিনীর এই বিদায়কে তাদের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক ‘বিজয়’ হিসেবে ফলাও করে প্রচার ও উদযাপন করছে, তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্থান হুট করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়; এর পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি বোঝাপড়া।
গত ১২ আগস্ট ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল জাইদির কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই নির্ধারিত সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়েছিল। ঘোষণা অনুযায়ী, আজকের এই ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই ইরাক থেকে সমস্ত মার্কিন ও বিদেশি সেনা পুরোপুরি প্রস্থান করবে। এর আগে গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে ওয়াশিংটন সফরকালে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টকমের কমান্ডার জেনারেল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হন। সেই বৈঠকে পারস্পরিক আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমেই মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের এই চূড়ান্ত ডেটলাইন নির্ধারিত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাক উভয় পক্ষই এখন থেকে একে অপরের সার্বভৌমত্ব, দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের প্রতি সম্মান এবং অর্থনীতি ও নিরাপত্তা খাতের অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার যৌথ অঙ্গীকারে অটল রয়েছে।
যদিও বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চূড়ান্ত প্রস্থান প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করছেন, তবে এর রাজনৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল মূলত ২০২৪ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে। সে সময়ই আইএস বিরোধী বৈশ্বিক জোটের সামরিক অভিযানের সমাপ্তি টানার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বাগদাদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আগামী ১ অক্টোবর ইরাকের ইতিহাসে একটি নতুন ও স্মরণীয় দিন হিসেবে চিহ্নিত হবে, কারণ এই দিন থেকে দেশটির মাটিতে আর কোনো বিদেশি সেনার সামরিক উপস্থিতি থাকবে না। দীর্ঘদিনের সংঘাত, অস্থিরতা ও রক্তক্ষয় কাটিয়ে দুই দেশ এখন পারস্পরিক অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের দিকে মনোনিবেশ করছে।
উল্লেখ্য, বর্তমান এই সেনা প্রত্যাহারের ইতিহাস গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে দুই দশক আগের একলড়াকু ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের সঙ্গে। আজ থেকে ঠিক ২৩ বছর আগে, ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ তৎকালীন ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে দেশটিতে আগ্রাসন শুরু করেছিল মার্কিন সামরিক বাহিনী। ওই অভিযানের মাত্র নয় মাসের মাথায় গ্রেপ্তার হন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন। দীর্ঘ তিন বছর ধরে চলা বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ভোরে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। সেই উত্তাল দিনগুলোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পেরিয়ে আজ মার্কিন বাহিনীর এই চূড়ান্ত প্রস্থানের মধ্য দিয়ে ইরাকের মাটিতে নতুন এক সার্বভৌম ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হতে যাচ্ছে। সূত্র: আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যম।