ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬,  ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
প্রগতির আড়ালে নৈতিক দেউলিয়া সমাজ: বিশ্ব যখন শেখায়, আমরা তখন পিছিয়ে সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ১ রান দূরে সাদমান, প্রথম দিনে বাংলাদেশের সংগ্রহ ২১৩ স্পেনে দ্রুতগতির দুই ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত অন্তত ৪৬ দেশে ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৯ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৯৮২ জাপানের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগের উদাত্ত আহ্বান তারেক রহমানের বাউফলে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে শ্রেণিকক্ষে কিন্ডারগার্টেন ও দুর্নীতির অভিযোগ ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচন ঘিরে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে ইসি ইসরায়েলে নির্বাচন: ৬০ শতাংশ ভোট গণনা শেষ, এগিয়ে নেতানিয়াহুর দল খাদ্যে পুষ্টি উপাদান যুক্ত করতে দ্রুত আইন প্রণয়নের তাগিদ প্রতিমন্ত্রীর ক্রসফায়ার মন্তব্যে কোণঠাসা আইজিপি, আলোচনায় ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান

পাকিস্তান-আফগানিস্তান দ্বন্দ্ব কেন আরও জটিল হচ্ছে


  • আপলোড সময় : বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সময় : ৯:২৮ এএম

২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার পর থেকেই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে গভীর অবনতি ঘটেছে। একসময়ে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় তালেবানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে ভূমিকা পালন করা ইসলামাবাদ এখন ঠিক একই গোষ্ঠীর সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি এবং শরণার্থী সংকটের মতো জটিল ইস্যুতে চরম বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে। দিল্লি পলিসি গ্রুপের ন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রোগ্রামের গবেষণা সহযোগী শ্রেয়াস দেশমুখের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে এসেছে। ওই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বর্তমান সম্পর্ক কেবল অবিশ্বাস, সহিংসতা এবং পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক চাপের এক দুষ্টচক্রে আটকে রয়েছে।

 

বিশ্লেষণটিতে উঠে এসেছে যে, পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আফগান তালেবানের বিরুদ্ধে টিটিপিকে নিরাপদ আশ্রয় ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতা দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ করে আসছে। তবে এখন পর্যন্ত ইসলামাবাদ এই অভিযোগের পক্ষে কোনো জোরালো বা পর্যাপ্ত প্রমাণ আন্তর্জাতিক মহলে উপস্থাপন করতে পারেনি। অন্যদিকে, কাবুল সরকারের স্পষ্ট অবস্থান হলো যে টিটিপি সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তানের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সমস্যা।

 

পাকিস্তানের পশতুন অধ্যুষিত উপজাতীয় অঞ্চলে শিকড় গেড়ে থাকা বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মোর্চা হলো এই টিটিপি, যা গত দুই দশকে পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অন্যতম বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৪ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন জারব-ই-আজব’ পরিচালনার পর বহু টিটিপি যোদ্ধা পালিয়ে আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে এই দলটির একটি অংশ আফগান তালেবানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে, আবার কিছু সদস্য জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আইএস খোরাসান বা আইএসকেপি গঠন করে। আফগান ভূখণ্ডে টিটিপির এই দীর্ঘ উপস্থিতি কেবল সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নই তুলছে না, বরং তালেবান সরকারের সার্বভৌমত্বের বৈধতা নিয়েও পাকিস্তানের সঙ্গে নিয়মিত সংঘাত তৈরি করছে।

 

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে আফগানিস্তানে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের উপস্থিতির কথা বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, গত পাঁচ বছরে আফগানিস্তানভিত্তিক কোনো সংগঠনের সীমান্তপারের বড় ধরনের হামলার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তুলনামূলকভাবে সীমিত, যদিও আইএসকেপির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। রাশিয়ার মস্কোর ক্রোকাস সিটি হলে চালানো ভয়াবহ হামলার দায় স্বীকার করেছিল এই আইএসকেপি। পাশাপাশি মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতেও সংগঠনটির ক্রমবর্ধমান তৎপরতা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এই বাস্তবতায় রাশিয়া, চীন এবং মধ্য এশিয়ার একাধিক দেশ তালেবান সরকারের সঙ্গে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ সুদৃঢ় করার উদ্যোগ নিয়েছে, যা আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

 

আফগান শরণার্থীদের অবস্থান এবং তাদের বহিষ্কারের বিষয়টি বর্তমান দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে লক্ষাধিক আফগান শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। তবে ২০০১ সালের পর থেকে দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শরণার্থীদের বহিষ্কারের প্রবণতাও তীব্র হয়েছে। ২০১৮ সালে ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআই সরকার গঠনের পর আফগান শরণার্থীদের প্রতি তুলনামূলক নমনীয় ও মানবিক নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল।

 

এমনকি সে সময় জন্ম নেওয়া শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। তবে ২০২৩ সালের ৯ মে ইমরান খানের গ্রেপ্তারের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক সহিংসতার সুযোগ নিয়ে বর্তমান জোট সরকার আফগানদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন শুরু করে। এর পেছনে একদিকে ইমরান খানের রাজনৈতিক সমর্থনভিত্তি দুর্বল করার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব রয়েছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংকট সামাল দেওয়া এবং তালেবানের ওপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করার কৌশলও কাজ করছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, যাদের এখন ফেরত পাঠানো হচ্ছে তাদের একটি বড় অংশ দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের শরণার্থী, যারা নিজের জীবনে কখনো আফগানিস্তান দেখেনি।

 

পরিশেষে, শ্রেয়াস দেশমুখের এই বিশ্লেষণে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আফগানিস্তানকে ঘিরে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ও কৌশলগত নীতি এখন এমন এক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে যেখানে পুরোনো প্রক্সি বা কৌশলগুলোই নতুন সমস্যার সৃষ্টি করছে। পাকিস্তানের সামরিক বিমান হামলা কিংবা শরণার্থী প্রত্যাবাসনের কঠোর নীতি শেষ পর্যন্ত টিটিপির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমর্থন বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

 

একই সঙ্গে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে পশতুন জাতীয়তাবাদ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধ এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। লেখকের মতে, পাকিস্তানের সামনে এখন দুটি কঠিন পথ খোলা রয়েছে—হয় তালেবান সরকারকে উৎখাতের ব্যর্থ ও ঝুঁকিপূর্ণ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, অথবা সশস্ত্র গোষ্ঠী ব্যবহারের পুরোনো কৌশল চিরতরে বর্জন করা। এই দুই পথের কোনোটিই সহজ নয়, যা আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।

(সূত্র: দিল্লি পলিসি গ্রুপ ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি)

 


এ সম্পর্কিত আরো খবর