আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চলমান উত্তেজনার আঁচ সরাসরি গিয়ে পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল খাত জ্বালানি বাজারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর থেকে চলমান অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে বা কমাতে সুস্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানানোর পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাগাতার ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে সপ্তাহের কার্যদিবসে আন্তর্জাতিক বাজারে বহুল ব্যবহৃত ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৩ মার্কিন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে নতুন করে অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
আল-জাজিরার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক এই মূল্যবৃদ্ধির পালায় আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেলের বিপরীতে আরও ১ দশমিক ১৪ ডলার বা প্রায় ১ দশমিক ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে এক লাফে এর বর্তমান বাজারমূল্য গিয়ে ঠেকেছে ব্যারেলপ্রতি ১০৩ দশমিক ৭৩ ডলারে। শুধু তাই নয়, চলতি মাসজুড়েই জ্বালানি তেলের বাজারে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তার ধারাবাহিকতায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সামগ্রিকভাবে প্রায় ১৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার পথে রয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত জুলাই মাসের পর থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের এটিই হলো সবচেয়ে বড় মাসিক মূল্যবৃদ্ধির রেকর্ড, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের বাজারেও এর বহুমুখী প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। সর্বশেষ তথ্যে জানা যায়, ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেলের বিপরীতে ৩৪ সেন্ট বা প্রায় শূন্য দশমিক ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে দাঁড়াল ৮৯ দশমিক ৭২ ডলারে। যদিও এর আগে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহের পরিমাণ কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় আগের দিন বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে সাময়িক স্বস্তি ও পতন দেখা গিয়েছিল, কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের অনমনীয় অবস্থানের কারণে সেই স্বস্তি বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। চলতি মাসে ডব্লিউটিআইয়ের দাম সার্বিকভাবে প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার পথে রয়েছে। এর আগে চলতি বছরের মে মাসের পর প্রথমবারের মতো ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম রেকর্ড গড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৬ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির সঙ্গে বৈশ্বিক তেলের বাজারের এই অস্থির সম্পর্ক নতুন কোনো বিষয় নয়। ইরানের ওপর মার্কিন প্রশাসনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং তেহরানের পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে জ্বালানি সরবরাহের প্রধান চেইন বারবার বিঘ্নিত হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এই ঘোষণায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর থেকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ছাড় দিতে রাজি নয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং জ্বালানি ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা সরাসরি বিশ্ববাজারে তেলের দামকে রেকর্ড উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান এই সংকটের কারণে বিভিন্ন আমদানিকারক দেশের উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ ও সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি তীব্রভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি এক বিরাট অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। যদি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পর্যায়ে এই সংকট দ্রুত নিরসন করা না যায়, তবে আগামী দিনে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদরা। (সূত্র: আল-জাজিরা)