আন্তর্জাতিক
অপরাধ আদালত (আইসিসি)-এর রেজিস্ট্রার ওসভালদো
জাভালা গিলের ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোর প্রতি রাজনৈতিক সমর্থনের জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে যেকোনো রাজনৈতিক চাপ ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা
করে আদালত তার স্বাধীন বিচারিক কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পারে। বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিদের এক উচ্চপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ
বৈঠকে এই আহ্বান জানানো
হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের
মুখে আইসিসির কাঠামোগত স্থিতিস্থাপকতা এবং বিচারিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন তিনি।
সুইজারল্যান্ডের
জেনেভা থেকে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত ইইউ-এর পাবলিক ইন্টারন্যাশনাল
ল - ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট সাবগ্রুপ (COJUR-ICC)-এর বৈঠকে একটি
ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য রাখেন আইসিসি রেজিস্ট্রার ওসভালদো জাভালা গিলের। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারকে শক্তিশালী, টেকসই ও বাধাহীন রাখতে
হলে আদালত নিজেই যেমন সচেষ্ট থাকবে, তেমনই এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর
সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা অপরিহার্য।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স (X)-এ আন্তর্জাতিক অপরাধ
আদালত কর্র্তৃক শেয়ার করা ওই ভিডিও বার্তায়
গিলের আরও বলেন, “বিচার ব্যবস্থাকে পুরোপুরি স্থিতিস্থাপক রাখা এবং আইসিসি যেন কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা বাধা ছাড়া
তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যেতে পারে, সেজন্য সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রচেষ্টা
অত্যন্ত প্রয়োজন।”
গিলের
তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, আদালতের দৈনন্দিন কার্যক্রম স্বচ্ছ ও দীর্ঘস্থায়ী করতে
অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াগুলো শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই। তবে শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়, এর জন্য সদস্য
রাষ্ট্রগুলোর সরাসরি রাজনৈতিক সমর্থন প্রয়োজন। তিনি বলেন, “ঠিক এই কারণেই আমি
আজ ব্রাসেলসে ইইউর দপ্তরে উপস্থিত হয়েছি, যাতে ইইউভুক্ত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে আইসিসিকে জোরালো রাজনৈতিক সমর্থন দেওয়ার কার্যকর উপায়গুলো খুঁজে বের করা যায়।” সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই তাদের এই বৈশ্বিক মিশন
ও ন্যায়বিচারের লড়াইকে অর্থবহ করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
আইসিসির
পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে যে, সিওজুল-আইসিসি (COJUR-ICC)-এর ওই বৈঠকে
গিলের বিশ্বজুড়ে মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত সবচেয়ে গুরুতর ও নৃশংস অপরাধের
শিকার হওয়া সাধারণ মানুষদের ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার মিশনে আদালতের পাশে থাকার আহ্বান জানান। বিশেষ করে বিশ্বমঞ্চে অপরাধের দায়মুক্তি রোধ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই রাজনৈতিক সমর্থনের
গুরুত্ব অপরিসীম।
বিশ্লেষকদের
মতে, আইসিসির রেজিস্ট্রারের এই আকস্মিক ও
গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান এমন এক সংবেদনশীল সময়ে
এসেছে যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নজিরবিহীন চাপ তৈরি করা হচ্ছে। এর আগে ওয়াশিংটন
কর্তৃপক্ষ আইসিসির ১৩ জন শীর্ষ
কর্মকর্তার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যার মধ্যে আদালতের মোট ১৮ জন বিচারকের
মধ্যে ৯ জনই অন্তর্ভুক্ত
রয়েছেন। গত সপ্তাহে জাতিসংঘের
সাধারণ পরিষদের হাই-প্রোফাইল বার্ষিক অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিরুদ্ধে তার পূর্বের সমালোচনার সুর আরও চড়ান এবং প্রকাশ্যেই সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে আদালত ত্যাগ করার আহ্বান জানান।
মার্কিন
প্রশাসনের এই তীব্র বিরোধিতার
মূল সূত্রপাত হয়েছিল যখন আইসিসি ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। উল্লেখ্য যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল কেউই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রতিষ্ঠাতা চুক্তি বা রোম স্ট্যাটিউটের
সদস্য নয়। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা আনোডোলু এজেন্সির সাংবাদিক বেয়জা বিন্নুর দনমেজ (Beyza Binnur Dönmez)-এর পাঠানো এই
প্রতিবেদন বৈশ্বিক রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার বর্তমান টানাপোড়েনকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
(সূত্র:
আনোডোলু এজেন্সি)