টানা
১৭ দিনব্যাপী দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য চিরুনি
অভিযানের পর অবশেষে অবরুদ্ধ
গাজা সিটির একটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত আবাসিক ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে ১০৫ জন ফিলিস্তিনির মরদেহ
ও অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন উদ্ধারকর্মীরা। ইসরায়েলি বর্বর বিমান হামলায় সম্পূর্ণ মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়া মধ্য গাজা সিটির ওই এলাকায় স্বজনদের
প্রিয় মুখগুলো খুঁজে পাওয়ার দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়েছেন শোকার্ত পরিবারগুলো।
ইস্তাম্বুল
থেকে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিধ্বস্ত হওয়া আল-তাজ এলাকায়
বুধবার সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে এই বিশেষ উদ্ধার
অভিযান পরিচালনার কথা জানানো হয়েছে। চরম ঝুঁকিপূর্ণ এই উদ্ধার অপারেশন
সফলভাবে সম্পন্ন করতে একটি মিশরীয় বিশেষ কমিটির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সমন্বয় করা হয়েছিল। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে উদ্ধার করা সাদা কাফনে মোড়ানো মৃতদেহগুলো যখন সারিবদ্ধভাবে মাটিতে শুইয়ে রাখা হয়, তখন সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের
অবতারণা হয়। প্রিয়জনদের শেষবারের মতো একনজর দেখা এবং তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে উপচে পড়া ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
উদ্ধার
অভিযানের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল আনোডোলু এজেন্সিকে জানান, “যাঁদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, তাঁরা সবাই সাধারণ বেসামরিক নাগরিক এবং রক্ত-মাংসের মানুষ। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে শান্তিতে ও নিরাপত্তার সঙ্গে
স্বাভাবিক জীবনযাপন করার পূর্ণ অধিকার তাঁদের রয়েছে।” তিনি গাজার অবরুদ্ধ ভূখণ্ডে সাধারণ মানুষের জীবন সুরক্ষায় অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জোরালো দাবি জানান।
এই
নির্মম ও নৃশংস ধ্বংসযজ্ঞে
নিজের পুরো পরিবারকে চিরতরে হারিয়েছেন তাঘরিব আল-হানাবি। ইসরায়েলি
হামলায় তাঁর কৃতি চিকিৎসক কন্যা আলিয়া রামজি আল-হানাবি, তাঁর
স্বামী এবং চার শিশু সন্তান অত্যন্ত মর্মান্তিক পরিণতি বরণ করেন। অশ্রুসিক্ত নয়নে তিনি গণমাধ্যমকে জানান, “ইসরায়েলি হামলায় তাদের গোটা পরিবারটিকে সিভিল রেজিস্ট্রি থেকে একেবারে মুছে ফেলা হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজকের এই
দিনে আমাদের পুরোনো ক্ষত আবারও জেগে উঠেছে, তবে অন্তত আমি আমার প্রিয়জনদের অবশিষ্টাংশগুলো শেষবারের মতো বুকে জড়িয়ে ধরতে পেরেছি এবং তাদের যথাযথ মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন করতে পেরেছি।”
ওই
এলাকার এক স্থানীয় বাসিন্দা
এবং ট্র্যাজেডি থেকে বেঁচে যাওয়া সৌভাগ্যবান ব্যক্তি ফাওয়াজ জিয়ারা জানান, ইসরায়েলি বাহিনী যখন ওই বিশাল আবাসিক
ভবনে আকস্মিক হামলা চালায়, তখন সেখানে প্রায় তিনশ মানুষের সমাগম ছিল। ওই হামলায় তারা
সবাই হতাহত হন এবং এখনও
বহু মানুষ ও তাঁদের মরদেহ
কংক্রিটের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে রয়েছে।
এদিকে
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবর
মাসে সম্পাদিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষ থেকে লাগাতার লঙ্ঘনের ফলে এখন পর্যন্ত নতুন করে ১ হাজার ৪৩১
জন ফিলিস্তিনির প্রাণ গেছে এবং আহত হয়েছেন ৫ হাজার ২৬
জন। অপরদিকে, ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে
শুরু হওয়া ইসরায়েলের নজিরবিহীন ও ধ্বংসাত্মক সামরিক
আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত গাজা উপত্যkায় মোট নিহতের সংখ্যা ৭৪ হাজার ছাড়িয়ে
গেছে এবং আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৫
হাজারের অধিক মানুষ। টানা হামলার মুখে গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ অবকাঠামো,
বাসস্থান ও চিকিৎসাকেন্দ্র আজ
ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা আনোডোলু এজেন্সির সাংবাদিক হোসনি নেদিম (Hosni Nedim) ও তারেক চুইরেফ
(Tarek Chouiref)-এর পাঠানো এই প্রতিবেদন ফিলিস্তিনিদের
ওপর চলা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। সূত্র: আনোডোলু এজেন্সি