যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান তীব্র সামরিক সংঘাতের মধ্যে প্রচারযুদ্ধকে ভিন্নমাত্রায় নিয়ে গেছে তেহরান। যুদ্ধক্ষেত্রের গোলাবারুদের পাশাপাশি এবার বিশাল আকৃতির বিলবোর্ড ও গ্রাফিক শিল্পকে কার্যকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান। রাজধানী তেহরানের রাজপথ ও ফ্লাইওভারগুলোর মোড়ে মোড়ে প্রদর্শিত হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে তৈরি নানা ব্যঙ্গচিত্র ও রাজনৈতিক বার্তা। কখনো ট্রাম্পের মুখ সেলাই করা, আবার কখনো তাকে জাদুকরের বাক্সে বন্দি দেখানোর মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের বিজয়ের দম্ভ ও কঠোর অবস্থান তুলে ধরছে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি।
আরব নিউজ ও এনবিসি নিউজের এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, তেহরানের বিখ্যাত ভ্যালিয়াসর স্কয়ারসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে টাঙানো এসব বিশালাকৃতির পোস্টার সাধারণ মানুষের নজর কাড়ছে। তেহরানের ‘খানেহ-য়ে তাররাহান’ বা ‘ডিজাইনার্স হাউস’ নামক প্রতিষ্ঠানের একদল তরুণ ডিজাইনার অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এসব রাজনৈতিক বার্তা ভিজ্যুয়াল রূপ দিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানটির ৩২ বছর বয়সী স্টুডিও ব্যবস্থাপক মোস্তাফা কাফায়ির ভাষ্যমতে, কোনো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বা সামরিক ঘটনা ঘটার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তা গ্রাফিক্সে রূপ দিয়ে রাজপথে ফুটিয়ে তোলা হয়। এই কাজে তারা ফটোশপের পাশাপাশি চ্যাটজিপিটি ও বিভিন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই টুল দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করছেন।
তেহরানের দেওয়ালে টাঙানো একটি আলোচিত ব্যঙ্গচিত্রে দেখা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঠোঁট সুতা দিয়ে সেলাই করা এবং হরমুজ প্রণালির পানি দিয়ে তার মুখ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এর নিচে বড় করে লেখা রয়েছে ‘চূড়ান্ত সীমায়’। গত মে মাসে হরমুজ প্রণালি যখন সংঘাতের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়, তখন এই নকশাটি করা হয়েছিল। এছাড়া আরেকটি বিলবোর্ডে ট্রাম্পকে কোকাকোলা ও হ্যামবার্গারসহ একজন জাদুকরের বাক্সে আটকে থাকা অবস্থায় দেখিয়ে সতর্ক করা হয়েছে যে, ‘চোখের পলক ফেললেই আপনি শেষ!’ গত জুলাইয়ে তুরস্কে নিরাপত্তাজনিত কারণে ট্রাম্পকে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে ক্যাটারিং ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে ইঙ্গিত করেই এই ব্যঙ্গচিত্রটি তৈরি করা হয়েছে।
শুধু ট্রাম্পের ব্যঙ্গচিত্রই নয়, মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর ইরানের আধিপত্যের নানা চিত্রও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এসব বিলবোর্ডে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ‘হরমুজ ক্যাচ’ অভিযানকে কেন্দ্র করে তৈরি একটি পোস্টারে দেখা যায়, একজন ইরানি সেনা একটি মার্কিন পানির নিচের ড্রোন পা দিয়ে মাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এবং নিচে লেখা রয়েছে ‘ব্যবসা ভালোই চলছে।’ এছাড়া বিখ্যাত রক ব্যান্ড নির্ভানার ‘নেভারমাইন্ড’ অ্যালবামের প্রচ্ছদের আদলে তৈরি আরেকটি চিত্রে ট্রাম্পকে পানির নিচে ডলারের নোট আঁকড়ে ধরে থাকতে দেখা যায়, যার পাশে লেখা রয়েছে ‘মহাবিজয়! হরমুজ প্রণালি।’ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল ব্যাহত এবং মার্কিন অবরোধের বিপরীতে এসব বিলবোর্ডকে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে দেখছে তেহরান।
তেহরানের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও এই বিলবোর্ডগুলো বেশ কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফার্মেসি কর্মী ২৪ বছর বয়সী সাহার জাহেদি মনে করেন, ব্যস্ত জীবনের ভিড়ে নিয়মিত খবর পড়ার সময় সবার না থাকলেও এসব বিলবোর্ড সাধারণ মানুষকে চলমান রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল রাখতে দারুণ ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে, ৫৩ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত মাহমুদ রেজাই জানান, বিলবোর্ডের পেছনের প্রতীকী অর্থ বুঝতে অনেক সময় কিছুটা ভাবতে হয়, যা মানুষের চিন্তার খোরাক জোগায়। সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান বৈরিতা ও বহুমুখী উত্তেজনার মাঝে তেহরানের রাজপথের এসব বিলবোর্ড কেবল প্রচারের মাধ্যম নয়; বরং এটি এখন দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা ও যুদ্ধ বর্ণনার এক শক্তিশালী দৃশ্যমান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।