বুয়েনস আইরেস টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের তীব্র অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা এবং বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ধনী বিদেশিদের আকৃষ্ট করতে নতুন একটি নাগরিকত্ব কর্মসূচি চালুর ঘোষণা দিয়েছে আর্জেন্টিনা। দেশটির প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই প্রশাসন ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ নামে পরিচিত এই বিশেষ কর্মসূচির আওতায় নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ অনুদান বা সরকারি বন্ডে বিনিয়োগের বিনিময়ে বিদেশি নাগরিকদের নাগরিকত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচিটির ঘোষণা দেওয়া হয়। চলতি বছরের শেষ প্রান্তিক বা চতুর্থ প্রান্তিকে এটি পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় আগ্রহী বিদেশি আবেদনকারীরা নাগরিকত্ব অর্জনের জন্য দুটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির যেকোনো একটি বেছে নিতে পারবেন।
প্রথম পদ্ধতি অনুযায়ী, আবেদনকারীকে আর্জেন্টিনার জাতীয় কোষাগারে ৩ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার অপূরণীয় বা ফেরতযোগ্য নয় এমন অর্থ জমা দিতে হবে। এছাড়া আবেদনকারীর স্বামী বা স্ত্রীকে এই নাগরিকত্বের আওতায় আনতে হলে অতিরিক্ত ১ লাখ ডলার এবং ১৮ বছরের কম বয়সী প্রতিটি সন্তানের জন্য ২৫ হাজার ডলার পরিশোধ করতে হবে। হিসাব অনুযায়ী, চার সদস্যের একটি পরিবারের জন্য মোট খরচ দাঁড়াবে ৫ লাখ মার্কিন ডলার। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
নাগরিকত্ব অর্জনের দ্বিতীয় পথটি হলো আর্জেন্টিনা সরকারের বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত একটি সরকারি বন্ডে ৮ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করা। এই বিশেষ বন্ডটি কেবল এই নাগরিকত্ব কর্মসূচির জন্যই তৈরি করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে অর্জিত সমস্ত অর্থ আর্জেন্টিনার অভ্যন্তরীণ আর্থিক ও রাজস্ব পরিস্থিতিকে আরও সুদৃঢ় করতে ব্যবহার করা হবে।
তবে শুধু অর্থ প্রদান করলেই নাগরিকত্ব পাওয়া নিশ্চিত হবে না। প্রতিটি আবেদন অত্যন্ত কঠোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হবে। জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা, আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা এবং আর্জেন্টিনার নাগরিকত্বের আন্তর্জাতিক সম্মান ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে এই প্রক্রিয়া কঠোরভাবে পরিচালনা করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। একই সঙ্গে অবৈধ অর্থ পাচার রোধ করতেও কর্মসূচিতে বিশেষ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে আবেদন যাচাই ও চূড়ান্ত নাগরিকত্ব পেতে ঠিক কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা এখনো জানানো হয়নি।
এদিকে আগামী বছর আর্জেন্টিনায় জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন এই ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ কর্মসূচি তীব্র রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এর আগে দেশটিতে বিদেশিদের জন্য কৃষিজমি ক্রয়ের সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে একটি আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাজনৈতিক চাপ ও প্রবল বিরোধিতার কারণে সরকারের সেই পরিকল্পনা সংশোধন করতে হয়েছিল।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের যে বৃহত্তর সংস্কার পরিকল্পনা রয়েছে, তারই একটি অংশ হলো এই নতুন গোল্ডেন পাসপোর্ট উদ্যোগ। এর অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আকর্ষণীয় কর সুবিধা, আইনি সুরক্ষা এবং শ্রমবাজারে বড় ধরনের সংস্কার আনা হয়েছে। এছাড়া বাণিজ্য ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শিথিল করে আর্জেন্টিনার অর্থনীতিকে আরও উন্মুক্ত করার চেষ্টা চলছে। তবে দেশের বিদ্যমান মূলধন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী এখনো বড় ধরনের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।