পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ায় এক মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় সামরিক বাহিনীর ২৫ জন যাত্রী ও ৭ জন ক্রু সদস্যসহ মোট ৩২ জন আরোহীর সবাই প্রাণ হারিয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে ঘটা বিমান দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স ২৪ ও বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, গত সোমবার দেশটির বেনিন সিটি থেকে অর্থনৈতিক রাজধানী লাগোসের উদ্দেশে নিয়মিত একটি মিশনে রওনা হয়েছিল নাইজেরীয় বিমান বাহিনীর এটিআর ৪২-৫০০ মডেলের একটি সামুদ্রিক টহল বিমান। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ওন্দো প্রদেশের ইগবোকোদা এলাকার একটি নৌঘাঁটি এবং জলাভূমির কাছাকাছি এসে বিমানটি হঠাৎ করেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিধ্বস্ত হয়। দুই ইঞ্জিনের এই টার্বোপ্রপ বিমানটিতে সাধারণত ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ জন যাত্রী বহন করার সক্ষমতা ছিল।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো নাইজেরিয়ায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দেশের এই অপূরণীয় ক্ষতিতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট বোলা টিনুবু। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়, সশস্ত্র বাহিনী ও পুরো জাতির জন্য এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও কঠিন এক মুহূর্ত। নিহত বীর সেনানি ও নাগরিকদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপ্রধান। এছাড়া, মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় নিহত বিমান বাহিনীর সদস্যদের স্মরণে দেশজুড়ে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। একইসঙ্গে নিহতদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান জানাতে সরকারি ও বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ও দেশটির বিমানমন্ত্রী ফেস্টাস কেইয়ামো যৌথভাবে জানিয়েছেন যে, দুর্ঘটনাস্থলটি একটি নৌঘাঁটির অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থিত। নিহতদের পরিবারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ পৌঁছানোর পর বিমান বাহিনীর পক্ষ থেকে তাদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করা হবে। এদিকে, দুর্ঘটনাস্থলের ঠিক এক কিলোমিটার দূরে বসবাসকারী এক প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দা দায়ো আকিন্তে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বিমানটি ভেঙে পড়ার মুহূর্তে তিনি বিকট এক শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন, যা তার কাছে তীব্র বজ্রপাতের মতো মনে হয়েছিল। ঘটনার পরপরই স্থানীয় জলাভূমিতে মাছ ধরতে যাওয়া এক ব্যক্তি দ্রুত বিষয়টি কাছের নৌঘাঁটি ও শহরের বাসিন্দাদের অবহিত করেন। এরপরই জরুরি সেবা সংস্থা, পুলিশ ও বিমান বাহিনী যৌথভাবে দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করে।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে নাইজেরিয়ার বিমানবাহিনীকে অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট বোলা টিনুবু। এর আগে ২০২১ সালের মে মাসে খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে কাদুনা প্রদেশে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে দেশটির তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইব্রাহিম আতাহিরুসহ বহু শীর্ষ কর্মকর্তা প্রাণ হারিয়েছিলেন। এছাড়া ২০১৫ সালের বিভিন্ন সময়েও নাইজেরিয়ায় বেশ কয়েকটি বড় ধরনের সামরিক বিমান ও হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা ঘটেছিল। তবে বর্তমান এই দুর্ঘটনাটি পুরো দেশকে নতুন করে স্তব্ধ করে দিয়েছে। (সূত্র: ফ্রান্স ২৪ ও এএফপি)