বিশেষ প্রতিনিধি, আবদুল কাইয়ুম খান
আমাদের গ্রামঘেঁষা হরিদেবপুর গ্রামের সন্তান ফজলুল হক বাগমার নয়ন ভাই আজ আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গেছেন। ছোটবেলা থেকেই তার পরিপাটি চেহারা এবং অমায়িক মার্জিত আচরণ সহজেই যে কাউকে মুগ্ধ করত। জীবনের চলার পথে কারো সঙ্গে কখনো খারাপ আচরণ করেছেন—এমন কোনো দৃষ্টান্ত বা ইতিহাস আমার চোখে কখনো পড়েনি। তীব্র প্রতিপক্ষ বা শত্রুর সঙ্গেও তিনি সর্বদা হাসিমুখে কথা বলতেন, যা ছিল তার চরিত্রের এক অনন্য ও বিরল ভূষণ। মানুষের এই পৃথিবীতে আগমন ও প্রস্থান এক অবধারিত সত্য, কিন্তু কিছু মানুষ তাদের মহৎ কর্ম ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে নেন; ফজলুল হক নয়ন ঠিক তেমনই একজন মানুষ ছিলেন, যাকে কখনোই ভোলা সম্ভব নয়।
নয়ন ভাইয়ের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতির পাতাগুলো অত্যন্ত গভীর। খুব সম্ভবত ১৯৮৩ সালে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সে সময় আমি তেজগাঁও কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থী ছিলাম এবং মধ্য বাড্ডায় ভাবিকে নিয়ে তিনি প্রথম বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন। আমার জীবনের একটি বিশেষ ঘটনার কথা আমি কখনো ভুলব না। তখন আমার মা গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করায় আমার খাওয়াদাওয়া নিয়ে বেশ কষ্ট পোহাতে হতো। বিষয়টি জানতে পেরে নয়ন ভাই অত্যন্ত স্নেহের সঙ্গে আমাকে প্রতিদিন তাদের ওখানে খাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। আমি একটানা এক মাস নিয়মিত সেখানে খেয়েছি। পরবর্তীতে আমার বাবা টাকা পাঠাতে চাইলেও তিনি তা বিন্দুমাত্র গ্রহণ করেননি। আজও গভীর কৃতজ্ঞচিত্তে সেই সোনালী দিনের কথা স্মরণ করি।
গতকাল বিকেলে তার চিরবিদায়ের সংবাদটি পাওয়ার পর থেকেই আমার মন ভীষণভাবে ছটফট করছে এবং আমি তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে নিরন্তর দোয়া করছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, শারীরিক অসুস্থতা আমাকে এমন এক অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে যে, তার শেষ বিদায় বা জানাজায় অংশ নিতে আমি সশরীরে উপস্থিত হতে পারিনি। আমার হৃদযন্ত্রে ছয়টি ব্লকের জটিল সমস্যা রয়েছে, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (সিকেডি)। ফলে দীর্ঘ যাতায়াত ও ভ্রমণ আমার শারীরিক অবস্থা কোনোভাবেই সমর্থন করে না।
সশরীরে উপস্থিত হতে না পারলেও দূর থেকেই তার জানাজার বিশাল আয়োজন ও অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেছি, যা আমাকে কিছুটা হলেও শান্তি দিয়েছে। হাজার হাজার মানুষের সমাগমে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানজনক এক শেষ বিদায় অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে তার, যা সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। ওই জানাজায় কালিগঞ্জ ও কাপাসিয়ার দুই মাননীয় সংসদ সদস্য অংশ নেন। বিশেষ করে কাপাসিয়ার মাননীয় সংসদ সদস্য তার আপন বেয়াই জনাব সালাউদ্দিন আইভীসহ দুই থানার বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জানাজায় শরিক হন। মরহুমের বড় ছেলে পাবেল অত্যন্ত সংযত ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে সম্পূর্ণ জানাজা অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।
কালীগঞ্জের রাজনৈতিক অভিভাবক এবং সাবেক বাংলাদেশ ছাত্রদল সভাপতি এ কে এম ফজলুল হক মিলন ভাই যখন অভিভাবকের সুদৃঢ় আসনে দাঁড়িয়ে আবেগাপ্লুত ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে নয়ন ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করছিলেন, তা শুনে আমার নিজের চোখ থেকেও অজান্তেই জল গড়িয়ে পড়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে ফজলুল হক বাগমার নয়ন অত্যন্ত সহজ-সরল মানুষ ছিলেন। জীবনের কোনো এক সময়ে তিনি প্রচুর বিত্তবৈভবের মালিক হলেও অহংকার তাকে স্পর্শ করতে পারেনি; বরং তিনি অকাতরে সাধারণ মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন। এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে তার অসামান্য অবদান রয়েছে এবং তিনি কখনো কারো প্রতি বিন্দুমাত্র প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক পদক্ষেপ নেননি।
গাজীপুর জেলা কালিগঞ্জ থানার সাবেক বিএনপির সহ-সভাপতি, ২০১৮ সালের উপজেলা চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী এবং মুক্তারপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক নয়ন ভাইয়ের মতো পরোপকারী মানুষের প্রয়াণ আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। মহান আল্লাহর দরবারে আমি বিনীত প্রার্থনা জানাই, তিনি যেন মরহুমকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন এবং তার শোকার্ত পরিবার ও স্বজনদের এই কঠিন শোক সহ্য করার তৌফিক দান করেন।