আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
কোনো
ধরনের রশি বা শরীরের সুরক্ষামূলক
প্যাডিং ছাড়াই ছয় ফুট লম্বা
কাঠের লাঠির ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষকে মাটিতে ফেলে দেওয়ার এই রোমাঞ্চকর লড়াই
বেলজিয়ামের নামুর শহরের ক্যাথেড্রালের সামনে ৬০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রতি বছর অত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
১৪১১
সাল থেকে চলে আসা এই ঐতিহ্যবাহী মল্লযুদ্ধে
প্রতিযোগীরা দুটি আলাদা দলে বিভক্ত হয়ে অংশ নেন। এর মধ্যে পুরোনো
শহরের প্রতিনিধিত্বকারী ‘মেলান’ দলের প্রতীকী রঙ হলো হলুদ-কালো এবং নতুন শহর ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন
গ্রামের প্রতিনিধিত্বকারী ‘আভ্রেস’ দলের প্রতীকী রঙ হলো লাল-সাদা। ঐতিহ্যবাহী ঢাকের তালে তালে প্রায় ৫০ জন সাহসী
প্রতিযোগী এই ব্যতিক্রমী লড়াইয়ে
অংশ নিয়ে থাকেন। এই প্রতিযোগিতায় বিশেষভাবে
ব্যবহৃত লাঠিগুলো মজবুত বিচ কাঠ দিয়ে তৈরি, যা সাড়ে ছয়
ফুট লম্বা এবং কোমর সমান উচ্চতায় মেটাল স্টিরাপ বা পা রাখার
ব্যবস্থা থাকে। বিশেষ নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিযোগীদের পা লাঠির সঙ্গে
শক্ত করে বেঁধে রাখা হয় না, যাতে
মাটিতে পড়ে যাওয়ার সময় প্রতিযোগী খুব সহজেই নিরাপদে লাঠি থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিতে পারেন।
এই
প্রাচীন লড়াইটি মূলত দুটি সুনির্দিষ্ট ধাপে সম্পন্ন হয়ে থাকে। প্রথম ধাপে দুটি দল মুখোমুখি লড়াইয়ে
অবতীর্ণ হয় এবং একে
অপরকে মাটিতে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। এরপর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ের পর খালি হয়ে
আসা মাঠে বিজয়ী দলের সদস্যরা চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য একে অপরের মুখোমুখি হন এবং শেষ
পর্যন্ত ট্রফির জন্য নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু করেন। প্রতিযোগিতার একদম শেষে বিজয়ী হওয়া একমাত্র একক প্রতিযোগী লাভ করেন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী গোল্ডেন স্টিল্ট ট্রফি, যা বিজয়ী ব্যক্তি
পুরো এক বছর নিজের
কাছে সগৌরবে ধরে রাখতে পারেন।
এটি
কেবল সাধারণ কোনো বিনোদনমূলক প্রদর্শনী নয়, বরং এটি ৬০০ বছরের এক নিরবচ্ছিন্ন ও
গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, অতীতে পঞ্চম চার্লস, চতুর্দশ লুই, পিটার দ্য গ্রেট এবং বিখ্যাত সম্রাট নেপোলিয়নের মতো বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বদের সামনেও এই রোমাঞ্চকর লড়াই
অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এমনকি বেলজিয়ামের নামুরের স্থানীয় শিশুরা মাত্র সাত বছর বয়স থেকেই অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে এই লাঠির লড়াইয়ের
প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করে। দীর্ঘ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির স্বীকৃতিস্বরূপ
২০২১ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা
ইউনেস্কো নামুরের এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে
তাদের বিশ্বমানবতার অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের (ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ) মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করে।
প্রতি
বছর সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় রবিবারে উদযাপিত ঐতিহ্যবাহী ‘ফেতে দ্য ওয়ালোনি’ উৎসব চলাকালীন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ৬ হাজার মানুষ
প্লেস সেইন্ট-ওবে চত্বরে এই অভাবনীয় লড়াই
সরাসরি উপভোগ করার জন্য সমবেত হন। সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা রিপ্লিস বিলিভ ইট অর নট-এর প্রকাশিত নতুন
বই ‘ওয়্যার্ড ইনটু উইয়ার্ড’-এ নামুরের এই
অবিশ্বাস্য ও রোমাঞ্চকর ঐতিহ্যের
বিস্তারিত তথ্য সচিত্র তুলে ধরা হয়েছে।