আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের নজিরবিহীন ও ভয়াবহ হামলায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রক্তক্ষয়ী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বিশ্বখ্যাত বার্তা সংস্থা রয়টার্স, এএফপি ও মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। মর্মান্তিক এই ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারানো ১২ জনের মধ্যে ২ জন প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ।
শনিবার স্থানীয় সময় আন্তর্জাতিক ব্যস্ততম কিং খালেদ বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে এই সশরীরে ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ চালায় হুথিরা। হামলার আকস্মিকতায় পুরো বিমানবন্দর এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। একাধিক স্থানে বিকট বিস্ফোরণের পর বেশ কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে এবং উদ্ধার তৎপরতা নির্বিঘ্ন রাখতে সৌদি আরবের অসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে বিমানবন্দরটির সব ধরনের বিমান উড্ডয়ন, অবতরণ ও সার্বিক পরিচালন কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও বাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ত কেন্দ্রবিন্দুতে এভাবে সরাসরি হামলা হওয়ায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
সৌদি অসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে নিহতের সঠিক পরিসংখ্যান ও জাতীয়তা নিশ্চিত করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, হামলায় ঘটনাস্থলেই ১২ জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে চারজন সৌদি আরবের নাগরিক, দুজন বাংলাদেশি প্রজাতি এবং একজন করে যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিস্তিন, জর্ডান, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের নাগরিক রয়েছেন। হামলায় আহত ৩০৯ জনকে উদ্ধার করে তড়িঘড়ি রিয়াদের বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যাদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, গত ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যে সংঘাতের সূচনা হয়েছিল, তার পর থেকে সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চলে এটিই কোনো আরব দেশের ওপর হওয়া সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী আক্রমণ।
এদিকে রিয়াদে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একের পর এক হুথি হামলার কারণে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বৃহৎ অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনা মারাত্মক বাধার মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রিয়াদ শহরকে বিশ্বমঞ্চে বাণিজ্য, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের অন্যতম বড় কেন্দ্রে পরিণত করার যে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা সৌদি রাজপরিবার গ্রহণ করেছিল, তা এই নিরাপত্তাহীনতার কারণে হোঁচট খেতে পারে। বিশেষ করে আগামী কয়েক সপ্তাহে রিয়াদে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও উচ্চপর্যায়ের মেগা ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, যা বর্তমান পরিস্থিতির কারণে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে, ইয়েমেনের ওপর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলা বৃদ্ধির জবাবেই এই আক্রমণ বলে দাবি করেছে হুথিরা। ইয়েমেনের ওপর ক্রমাগত সৌদি যুদ্ধবিমানের বোমাবর্ষণে শত শত বেসামরিক মানুষ ও শিশু প্রাণ হারাচ্ছে উল্লেখ করে হামলার পূর্ণ দায় স্বীকার করেছেন হুথিদের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি। তিনি সাফ জানান, সৌদি জোট যেভাবে ইয়েমেনের বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, হাসপাতাল, বাজার ও শোকসভার মতো বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করছে, বিশ্বকে তার জবাব দিতেই এই একই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। হুথিদের দাবি অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যতক্ষণ না পর্যন্ত ইয়েমেনের বেসামরিক স্থাপনায় হামলা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রতিপক্ষের জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
হামলার পরপরই মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, বিমানবন্দরমুখী প্রধান সড়কগুলো পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রেখেছে এবং অন্তত ছয়টি অ্যাম্বুলেন্সকে সাইরেন বাজিয়ে রক্তাক্ত আহতদের নিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটতে দেখা গেছে। এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসসহ পশ্চিমা কূটনৈতিক মিশনগুলো নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের বিমানবন্দর এলাকা এড়িয়ে চলাচলের এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়েও জলঘোলা হচ্ছে। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ঘটনার বিস্তারিত আপডেট সম্পর্কে অবহিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে মার্কিন সামরিক বাহিনী সরাসরি কোনো সামরিক পদক্ষেপ বা হস্তক্ষেপ করবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প সরাসরি কিছু প্রকাশ না করলেও স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, ‘এ বিষয়ে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ উল্লেখ্য, এর আগেও হুথি বিদ্রোহীদের দমনে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক সামরিক অভিযান চালিয়েছিল, যাতে স্বল্প সময়ে শত কোটি ডলারের বিপুল অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহৃত হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক এই অস্থিতিশীলতা নতুন করে এক বিশ্বযুদ্ধের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে গভীর চিন্তায় পড়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।