আন্তর্জাতিক
ডেস্ক:
গৃহযুদ্ধে
কোণঠাসা হয়ে পড়া মিয়ানমারের
সামরিক জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের নির্ধারিত কোটা পূরণের নামে
সাধারণ তরুণদের রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে
যাওয়া, অপহরণ এবং চড়া অর্থের
বিনিময়ে সেনাবাহিনীতে ‘বিক্রি’ করার এক চাঞ্চল্যকর
ও ভয়ংকর চিত্র সামনে এসেছে। সামরিক বাহিনীতে তীব্র লোকবলসংকট, যুদ্ধক্ষেত্রে একের পর এক
পরাজয় এবং সেনাসদস্যদের পলায়নের
মুখে জান্তা সরকারের এই বেপরোয়া পদক্ষেপে
দেশটির সাধারণ মানুষ ও দরিদ্র পরিবারের
যুবকদের মাঝে চরম আতঙ্ক
ছড়িয়ে পড়েছে।
মিয়ানমারের
দক্ষিণাঞ্চলীয় কারেন রাজ্যের রাজধানী হপা-আনসহ বিভিন্ন
শহরে এখন এক ভীতিকর
পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সন্ধ্যার পর ১৮ থেকে
৩৫ বছর বয়সী সুস্থ
ও সক্ষম তরুণদের ঘরের বাইরে বের
হওয়া প্রায় নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। জীবিকার
তাগিদে রাস্তায় নামা চালক বা
সাধারণ কর্মজীবীরাও প্রতিনিয়ত পরিবার থেকে সতর্কবার্তা পাচ্ছেন।
সূত্র মতে, জান্তার সাদাপোশাকধারী
সদস্য ও স্থানীয় সমর্থকেরা
নির্বিচারে তরুণদের আটক করে জোরপূর্বক
সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য
করছেন।
বাধ্যতামূলক
আইনের অপব্যবহার ও আর্থিক বাণিজ্য
২০২১
সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু
চিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকেই
মিয়ানমারে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ চলছে। যুদ্ধক্ষেত্রে চরম বিপর্যয়ের মুখে
২০২৪ সালে বাধ্যতামূলক সামরিক
নিয়োগ আইন কার্যকর করে
জান্তা সরকার। এ আইনে ১৮
থেকে ৩৫ বছরের পুরুষ
এবং ১৮ থেকে ২৭
বছরের নারীদের অন্তত দুই বছর সেনাবাহিনীতে
কাজ করার বিধান রয়েছে।
আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ পাঁচ
বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
তবে
সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়
থেকে নিয়োগের কোটা পূরণের জন্য
প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ায়
স্থানীয় পর্যায়ে এক অন্ধকার ও
অবৈধ বাণিজ্যের সূচনা হয়েছে। ফাঁস হওয়া তথ্য
ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় প্রশাসনের নিচুতলার কর্মকর্তা ও অপরাধী চক্র
তরুণদের উঠিয়ে নিয়ে অন্য ওয়ার্ড
বা সামরিক ইউনিটের কাছে অর্থের বিনিময়ে
হস্তান্তর করছে। ইয়াঙ্গুনের বাসিন্দা মা মোয়ে সান
পানের স্বামী ফিও ওয়াইকে স্থানীয়
ওয়ার্ড প্রশাসন কার্যালয় থেকে অন্য একটি
ওয়ার্ডের কাছে ৪০ লাখ
কিয়াটের বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়ার মর্মান্তিক
ঘটনা এই ব্যবস্থার নির্মম
বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে। সচ্ছল
ব্যক্তিরা ঘুষ বা অর্থের
বিনিময়ে সামরিক সেবা এড়াতে পারলেও
দরিদ্র পরিবারের তরুণদের ওপরই এর মূল
খড়্গ নেমে এসেছে।
সমাজ
ও অর্থনীতিতে গভীর সংকট
অ্যামনেস্টি
ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও ফোর্টিফাই রাইটসের
মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এই জোরপূর্বক কনক্রিপশন
ও মানব পাচারতুল্য অপতৎপরতার
তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। নিখোঁজ ও জোরপূর্বক তুলে
নেওয়ার ঘটনায় তরুণদের পরিবারগুলো প্রতিনিয়ত চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে
দিন কাটাচ্ছে। অনেকেই গ্রেফতার ও বলপ্রয়োগের ভয়ে
দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী থাইল্যান্ড
বা অন্যত্র পালিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতা টিকিয়ে
রাখতে জান্তা সরকারের এই মরিয়া অপচেষ্টা
মিয়ানমারের সামাজিক কাঠামো ও ভেঙে পড়া
অর্থনীতিকে আরও বড় বিপর্যয়ের
মুখে ঠেলে দিচ্ছে।