দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যে এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা তিনশো ছাড়িয়েছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন বয়সের দুই হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এমন এক সংকটজনক পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধের কার্যকর উপায় হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃত ‘কিউডেঙ্গা’ টিকা নিয়ে জনমনে ও নীতিনির্ধারক মহলে নতুন করে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে এই টিকাকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি এমন এলাকায় শিশু-কিশোরদের মধ্যে টিকাটি প্রয়োগের সুপারিশ করেছে। তবে বাংলাদেশে এই টিকা ব্যবহারের আগে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করা হবে, নাকি বিদ্যমান আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে শিগগিরই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসতে যাচ্ছে সরকার।
টিকার অনুমোদনের বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত স্পষ্ট করে জানান যে, যেকোনো নতুন টিকার অনুমোদন অবশ্যই তার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা-সংক্রান্ত কঠোর বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে দেওয়া উচিত। বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষের শারীরিক গঠনে টিকাটি কতটা কার্যকর ও নিরাপদ প্রমাণিত হবে, তা নিখুঁতভাবে যাচাই করা জরুরি। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও ভাইরোলজির শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ গবেষকদের সঙ্গে খুব দ্রুত বৈঠক করা হবে। পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য ও প্রমাণ ছাড়া ব্যাপকভাবে টিকা ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, বর্তমান প্রাদুর্ভাবে তাৎক্ষণিক বড় কোনো প্রভাব না ফেললেও আগামী বছরগুলোতে সংক্রমণ প্রতিরোধে এই টিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এর আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও জানিয়েছেন যে, টিকার উচ্চমূল্য এবং কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও গ্যাভির সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে দেখা গেছে যে, জাপানের টাকেডা ফার্মাসিউটিক্যালসের তৈরি ‘কিউডেঙ্গা’ টিকা ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরিতে অত্যন্ত সক্ষম। এর তৃতীয় পর্যায়ের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় আটটি দেশের প্রায় ২১ হাজার শিশু-কিশোর অংশ নিয়েছিল। ওই গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই টিকার ব্যবহারে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৮০ শতাংশ এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়ায় এই টিকার নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ধরনের সংশয়ের অবকাশ নেই বলে মনে করছেন বিশিষ্ট চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। নেদারল্যান্ডসের বিশিষ্ট ইমিউনোলজিস্ট ও টিকা উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. রেজাউল করিম জানিয়েছেন যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর স্ক্রিনিং ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সফলভাবে পেরেই এই টিকা অনুমোদন পেয়েছে।
টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বারী ও প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর মতে, ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা না থাকায় টিকা বা ভ্যাকসিনই একমাত্র কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা। কিউডেঙ্গা টিকাটি এমন একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন, যেখানে আগে কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে থাকুক বা না থাকুক, চার বছর বয়স থেকে শুরু করে ৬০ বছরের যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোনো পূর্ব পরীক্ষা ছাড়াই নিরাপদে এই টিকা গ্রহণ করতে পারবেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে বিশ্বের বহু দেশেই এর ব্যবহার সফলভাবে চলছে। বর্তমান ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত ওষুধ প্রশাসন শাখাকে এই টিকার লাইসেন্স দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।