সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 83
রেজাউল করিম ঝন্টু, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
কালিকা পুরাণ ও বৃহদ্ধর্ম পুরাণ অনুসারে, রাম ও রাবণের যুদ্ধের সময় শরৎকালে দুর্গাকে পূজা করা হয়েছিল। হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, শরৎকালে দেবতারা ঘুমিয়ে থাকেন। তাই এই সময়টি তাদের পূজা যথাযথ সময় নয়। অকালের পূজা বলে তাই এই পূজার নাম হয় "অকালবোধন"। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী মনে করা হয়, দেবীর দুর্গার মর্তে আগমন ও গমন যে বাহনে, তার ওপর নির্ভর করে গোটা বছরটা পৃথিবী বাসীর কেমন কাটবে। এবার দেবী দুর্গা আসছেন ঘটকে চড়ে আর দেবী দুর্গা বা উমা কৈলাসে ফিরবেন নৌকায় করে।
উল্লেখ্য, এ বছর ২০২৬ সালে মহালয়া পড়েছে ১০ অক্টোবর, মহাপঞ্চমী - ১৫ অক্টোবর, মহাষষ্ঠী- ১৬ অক্টোবর, মহাসপ্তমী - ১৭ ও ১৮ অক্টোবর, মহাঅষ্টমী - ১৯ অক্টোবর, মহানবমী - ২০ অক্টোবর এবং মহাদশমী - ২১ অক্টোবর।
শাস্ত্রমতে আরো বলা হয়ে থাকে সপ্তমীতে দেবী দুর্গার আগমন এবং দশমিতে গমন হয়। সাধারণত প্রতি বছর সপ্তমী ও দশমী কী বার পড়ছে তার ওপর নির্ভর করে দেবীর কিসে আগমন এবং গমন সেটা বোঝা যায়। শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ শেষ হতে না হতেই ধন সম্পদের দেবী লক্ষী পূজা শুরু হবে ঠিক আড়াই দিন পরে। এভাবে সনাতন ধর্মাবলম্বী চিরাচরিত একের পর এক পূজা অর্চনা শুরু হবে। আর এজন্য অনেকই বলে থাকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বারো মাসে তেরো পার্বণ। শুভ মহালয়ার থেকে দুর্গা পূজার ক্ষণগননা শুরু হয়।
তাই ২ অক্টোবর, বুধবার থেকে শুরু হবে মন্দিরে মন্দিরে মহালয়ার ঘট স্থাপন, বিশেষ পূজা, শঙ্খের ধ্বনি ও চন্ডিপাঠের মধ্যে দিয়ে দেবীকে আমন্ত্রন জানানো হবে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ শারদীয় দুর্গা পূজা নির্বিঘ্নে করতে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দর্শনার্থী ও ভক্তদের সামাজিক দুরত্ব মেনে প্রতিমা দর্শন ও অঞ্জলি প্রদান, ব্যাপক অলোকসজ্জা না করা সহ বেশ কিছু নির্দেশনা। উপজেলার বিভিন্ন পাল পাড়ায় ঘুরে দেখা গেছে কারিগর গণ সুনিপুণ হাতে কার্তিক, গণেশ, লক্ষী, স্বরস্বতী, অসুর, সিংহ, ময়ুর, পেঁচা, ইদুর, হাঁস, সাপ, মহাদেবের মৃত্তিকা মূর্তি তৈরী করছেন।
প্রতিমা তৈরী এবং প্রতিমায় রং তুলির আচর যথাসময়ে শেষ করতে দিবা রাত্রি সমান্তরালে কাজ করছেন। কারিগর গণ জানিয়েছেন, নানা প্রতিকুলতার মধ্যে তাদের এই পেশা টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে। যে মুজুরী পাওয়া যাচ্ছে তা দিয়ে তাদের সংসার চালানো খুবই কষ্টকর। এদিকে প্রতি বছরই প্রতিমা তৈরির উপকরণের দাম বাড়ছে। তবে শুধুমাত্র পারিশ্রমিক নয় মায়ের ভক্তি পেতেই তাকে প্রকৃত রূপে ফুটিয়ে তুলতে পরিশ্রম করেন এবং তার শক্তিতেই কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানান। দুর্গাপূজাকে উপলক্ষ করে পূজা উদযাপন কমিটির লোকজন ও প্রতিমা শিল্পীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। পাশাপাশি হিন্দু নর-নারীরা পূজার কেনা-কাটা সহ বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ডে সময় ব্যয় করছেন।
চলতি বছরে তাড়াশ উপজেলায় ৫০টি পুজা মন্ডপে শারদীয় উৎসব শুরু হবে। তবে বাজারপাড়া দুর্গা মন্দিরের পুজা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। তবে ওখানের নারীরা সেই শংকাকে তুরি মেরে উরিয়ে দিয়েছে। তারা নিজেরাই সকল দায়িতত্ব মাথায় নিয়েছে। তারা নিজেদের মধ্যে কমিটি করে পুজোর সকল দায়িত্ব পালন করছে। যা এক ব্যতিক্রমি উদাহরণ। তাড়াশ পৌরসভায় ও সদর ইউনিয়ন মিলে -১৫টি, মাধাইনগর ইউনিয়নে -৭টি, দেশীগ্রাম ইউনিয়নে -১০টি, তালম ইউনিয়নে -৮টি, বারুহাঁস ইউনিয়নে - ৫টি, মাগুড়া বিনোদ ইউনিয়নে-৩টি ও নওগাঁ ইউনিয়নে-২টি মন্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান তাড়াশ উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আশুতোষ সান্যাল।
তিনি আরও বলেন, প্রতিবছই প্রশাসনিক নিরাপত্তাসহ সার্বিক সহযোগিতায় পেয়ে আসছি। এছাড়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেত্রীবৃন্দ ও স্থানীয় ব্যক্তি বর্গের সহযোগিতায় এ পর্যন্ত সফলতার সহিত বিভিন্ন পূজা উৎসব উদযাপন করে আসছি। আশা করছি এবারও সফলতার সহিত শারদীয় দুর্গা পূজা সম্পন্ন হবে। বাকীটুকু মা দুর্গাদেবী ও ভগবানের কৃপা।
পল্লী বিদ্যুৎ তাড়াশ জোনাল অফিস এর ডিজিএম জানান, পূজার এই কয়টা দিন নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে বিদ্যুৎ থাকবে বলেই আশা করছি। প্রাকৃতিক কোন দুর্যোগ বা জাতীয় গ্রিডে কোন সমস্যা না হলে বিদ্যুৎ এর সমস্যা হবে না। তাছাড়া তাড়াশ উপজেলায় ৫০টি পূজামন্ডবের প্রত্যেকটিতে বিদ্যুৎ সংযোগ আছে। তবে আপত কালীন ব্যবস্থা হিসাবে প্রত্যেক পূজামন্ডবে বিদ্যুৎ এর পাশাপাশি জেনারেটর রাখার জন্য সকল পূজা মন্ডবের কমিটি'র নিকট অনুরোধ জানিয়েছেন।
তাড়াশ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ইমাম জাফর বলেন, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যাতে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে না পারে, সে বিষয়ে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো প্রতিরোধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আশা করছি, কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই সুন্দরভাবে পূজা সম্পন্ন হবে।