রাজধানী ঢাকায় ক্রমেই উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে সংসার ভাঙার ঘটনা। পারিবারিক নির্যাতন, মানসিক অবহেলা, চারিত্রিক সন্দেহ, মাদকাসক্তি, তীব্র আর্থিক টানাপড়েন এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার দূরঘোর অভাব দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একই সাথে বিচ্ছেদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পুরুষদের তুলনায় নারীদের এগিয়ে থাকার এক অভূতপূর্ব ও ব্যতিক্রমী চিত্র উঠে এসেছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যানে। ২০২৩ সাল থেকে শুরু করে চলিত ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত সংগৃহীত তালাকের আবেদন ও তা চূড়ান্ত কার্যকরের হিসাবে দেখা গেছে, নারীদের পক্ষ থেকে বিচ্ছেদের উদ্যোগ গ্রহণের হার পুরুষদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) দেওয়া প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ওই অঞ্চলভুক্ত এলাকায় মোট ২৩ হাজার ৩৯৯টি বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাক আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে নারীদের পক্ষ থেকে স্বপ্রণোদিত হয়ে আবেদনের মাধ্যমে কার্যকর হয়েছে ১৬ হাজার ৮৪৮টি এবং পুরুষদের আবেদনে কার্যকর হয়েছে মাত্র ছয় হাজার ৫৫১টি তালাক।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) রেজিস্ট্রি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত তালাকের জন্য মোট আবেদন জমা পড়েছে ১৯ হাজার ৮৬৭টি। এর মধ্যে নারীদের পক্ষ থেকে দেওয়া আবেদনের সংখ্যা ১২ হাজার ৪৫০টি এবং পুরুষদের আবেদনের সংখ্যা ছিল সাত হাজার ৪১৭টি। দুই সিটি করপোরেশনের এই সামগ্রিক তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নারীদের পক্ষ থেকে সংসার বিচ্ছেদের চূড়ান্ত উদ্যোগ নেওয়ার হার পুরুষদের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ১ গুণ বেশি।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে দক্ষিণ সিটিতে সাত হাজার ৫১৪টি তালাক আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে কেবল দক্ষিণ সিটিতেই প্রায় ২৮টি সংসার ভেঙে যাচ্ছে। একই সময়ে উত্তর সিটিতে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে দুই হাজার ৮৫১টি তালাক কার্যকর হয়েছে, অর্থাৎ সেখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬টি বিচ্ছেদ ঘটছে। সার্বিকভাবে পুরো রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৪টি পরিবার বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানী ও সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্মকর্তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অনুযায়ী জানা যায়, দাম্পত্য জীবনে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌতুকের কড়া চাপ, সঠিক ভরণপোষণ না দেওয়া, বিবাহবহির্ভূত সামাজিক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সম্পর্ক, মাদকের আসক্তি, অমূলক সন্দেহপ্রবণতা, পারিবারিক অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ এবং পেশাগত ব্যাস্ততায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সময় ও যোগাযোগের ঘাটতি এই বিচ্ছেদের পেছনে মূল ভূমিকা পালন করছে।
এই চরম সামাজিক বিপর্যয় নিয়ে সমাজ-অপরাধ বিশ্লেষকরা জানান, রাজধানীতে উচ্চশিক্ষিত ও কর্মজীবী নারীদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়লেও এটিকে সরাসরি বিবাহবিচ্ছেদের একমাত্র কারণ বলা যুক্তিযুক্ত নয়। মূল সংকট তৈরি হচ্ছে দাম্পত্য সম্পর্কের ভেতরের পারস্পরিক সহনশীলতা, পারস্পরিক ধৈর্য এবং আলোচনার মাধ্যমে সুরাহা করে যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়া থেকে।