দেশের ইতিহাসে পারমাণবিক যুগে প্রবেশের পথে আরেকটি ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হলো। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)। এর মধ্য দিয়ে দেশের সর্ববৃহৎ এই মেগা প্রকল্পের বাণিজ্যিক উৎপাদনের পথে আরও একধাপ অগ্রগতি হলো। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জোরালো প্রত্যাশা, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী মাসেই জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন প্রদান করেছেন বায়েরা চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান। অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ এই প্রথম ইউনিটের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট, যা দেশের বিদ্যুৎ খাতে এক বিশাল সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান গণমাধ্যমকে জানান, প্রথম ইউনিটে হট কমিশনিংয়ের প্রাথমিক উপধাপ ‘বি-১’ পর্যায়ের কাজ ইতিমধ্যে প্রায় সফলভাবে শেষ হয়েছে। এই বিশেষ পর্যায়ে মূলত প্রাথমিকভাবে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং এবং চুল্লির সাব ক্রিটিক্যাল অবস্থা যাচাইয়ের অত্যন্ত সংবেদনশীল কাজ সম্পন্ন করা হয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কঠোর দিকনির্দেশনা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পুরোপুরি অনুসরণ করেই এই সমস্ত কার্যক্রম অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করা হয়েছে। ইউনিটটিতে ‘বি-২’ পর্যায়ের প্রয়োজনীয় ভৌত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কারিগরি কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পরই বায়েরা এই ঐতিহাসিক অনুমোদন প্রদান করেছে।
ড. মো. জাহেদুল হাসান আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কমিশনিং কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়, তবে আগামী মাসের মধ্যেই জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সতর্ক করে জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিক অনুমোদন মেলার পর প্রথম ইউনিট থেকে সরাসরি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে আরও বেশ কিছু জটিল ও সংবেদনশীল ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করতে হবে। তারা জানান, এখন এই পুরো প্রকল্পটিকে ‘সি’ পর্যায়ে প্রবেশ করতে হবে। এই নির্দিষ্ট পর্যায়ে চুল্লির ক্ষমতা ধাপে ধাপে ধীরে ধীরে বাড়িয়ে চালু অবস্থায় প্রধান যন্ত্রপাতি এবং বিভিন্ন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হবে।
প্রকল্পের সংরক্ষিত নথি অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে চূড়ান্ত সংযোগ স্থাপনের পূর্বে চুল্লির ক্ষমতা পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধির পরীক্ষা এবং বহুমুখী যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা নিবিড়ভাবে যাচাই করা অপরিহার্য। বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যক্রম শুরু করার আগে কমিশনিং প্রক্রিয়ার আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক।
কর্মকর্তারা আরও জানান, এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অন্যতম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ হলো জেনারেটরকে সরাসরি জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সমন্বিত করা। এর মাধ্যমে মূলত কেন্দ্রটির ধারাবাহিকভাবে ও নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রকৃত সক্ষমতা যাচাই করা সম্ভব হবে। রূপপুর প্রকল্পের এই পদক্ষেপে দেশের বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যৎ রূপরেখায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।