খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে দেশজুড়ে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। ভারত থেকে আমদানিকৃত সরকারি গুদামের চালের নমুনায় মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্যান্সার সৃষ্টিকারী বিষাক্ত উপাদান ‘আফলাটক্সিন’-এর উপস্থিতি ধরা পড়েছে। এই ভয়াবহ সত্য উদঘাটিত হওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে খাদ্য অধিদপ্তর তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে ওই পুরো চালানের প্রায় সাড়ে ৯ হাজার টন চালের বিতরণ কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতি টন ৩৫৩ দশমিক ১১ ডলার মূল্যে মোট ৫০ হাজার টন চাল আমদানির চুক্তির অংশ হিসেবে এই চাল সরবরাহ করেছিল সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল। চুক্তি অনুযায়ী চালের এই চালানটি বাংলাদেশে এসে পৌঁছায় এবং তা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের সরকারি গুদামগুলোতে সংরক্ষণ করা হয়। তবে গুদামে পৌঁছানোর পর চালের মান নিয়ে কর্মকর্তাদের মাঝে উদ্বেগ দেখা দেয়। কিছু চাল অত্যন্ত নিম্নমানের এবং খাওয়ার অনুপযোগী বলে উল্লেখ করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বন্দর থেকে প্রায় ১ হাজার ৩৭৮ টন চাল জাহাজে ফেরত পাঠানো হলেও বাকি ৯ হাজার ৫০০ টন চাল গ্রহণ করা হয়।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ১৭ আগস্ট। ওই দিন চট্টগ্রামের হালিশহর ও দেওয়ানহাট সেন্ট্রাল স্টোরেজ ডিপোর চালের স্তূপ থেকে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল নমুনা সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে হালিশহর এবং ঢাকার একটি সরকারি গুদামের নমুনায় মানবদেহে ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী বিষাক্ত উপাদান ‘আফলাটক্সিন’-এর উপস্থিতি মেলে। ব্রির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কাজী শিরীন আক্তার জাহান গণমাধ্যমকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত চালে প্রাকৃতিকভাবে আফলাটক্সিন তৈরি হতে পারে। নমুনায় যা শনাক্ত হয়েছে, তার মাত্রা সহনীয় পর্যায়েই রয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সহনীয় মাত্রা অতিক্রম করলে আফলাটক্সিন স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এদিকে হালিশহর সিএসডির ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান জানান, খাদ্য কর্মকর্তারা এই লটের চাল দুবার পরীক্ষা করেছেন এবং ডিপো কর্তৃপক্ষকে চাল বিতরণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন; তবে পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক ফলাফল এখনো ডিপোতে পৌঁছায়নি। চট্টগ্রাম খাদ্য বিভাগের চলাচল ও সংরক্ষণ নিয়ন্ত্রক রেজওয়ান সাকিবও চাল বিতরণ বন্ধ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
চালে বিষাক্ত উপাদান পাওয়ার এই দাবির পর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল তা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, বাংলাদেশের খাদ্য কর্মকর্তা এবং সরবরাহকারীর যৌথভাবে সংগৃহীত নমুনা ভারতের একটি পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং তা চুক্তির শর্তাবলি পূরণ করেছিল। এক ইমেইলে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ব্রিতে পরীক্ষা করা সিলগালা যৌথ নমুনায় কোনো আফলাটক্সিন পাওয়া যায়নি বলেও তাদের জানানো হয়েছিল। নিজেদের দাবির সপক্ষে তারা এসজিএস প্রতিবেদনের পাঁচ ও ছয় নম্বর পৃষ্ঠার উল্লেখ করে। মান বজায় রাখতে তারা যথাযথ কার্যপ্রণালী অনুসরণ করেছিল এবং বিতরণ স্থগিত করার আগে এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পায়নি।
অন্যদিকে, শিপিং এজেন্ট সেভেন সিজ শিপিং লাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী আকবর অভিযোগ করেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি সরবরাহকারীর সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, এমনটা চলতে থাকলে কোনো আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী বাংলাদেশে খাদ্যশস্য সরবরাহে আগ্রহ দেখাবে না, যা দেশকে বিপাকে ফেলবে।
এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে; বিশেষ করে প্রাথমিক নমুনাগুলো পুরো চালানের সঠিক প্রতিনিধিত্ব করেছিল কি না তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। কর্তৃপক্ষ এখনো চালে থাকা বিষাক্ত উপাদানের সুনির্দিষ্ট ঘনত্ব প্রকাশ করেনি, কিংবা চিহ্নিত চালের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বা অন্যান্য গুদামে আরো পরীক্ষা চালানো হবে কি না সে বিষয়েও স্পষ্ট কিছু জানায়নি। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম জসিম উদ্দিন খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।