মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে চলমান টেস্টের তৃতীয় দিনটি বেশ নাটকীয়তা ও রোমাঞ্চে ভরপুর ছিল। প্রথম ইনিংসে ক্যারিবীয়দের অলআউট করার পর নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে মারাত্মক ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়েছিল স্বাগতিক বাংলাদেশ দল। ক্যারিবীয় স্পিনার ও পেসারদের ভয়ংকর বোলিং তোপে একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল টাইগাররা একশো রানের লিডও পার করতে পারবে না। তবে চরম বিপদের মুখে হাল ধরে জাকের আলী অনিক ও নাঈম হাসানের দায়িত্বশীল ও দৃঢ়তাপূর্ণ ব্যাটিংয়ে নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে বাংলাদেশ শিবির। শেষ পর্যন্ত আলোকস্বল্পতার কারণে তৃতীয় দিনের খেলা আগেভাগেই বন্ধ ঘোষণা করার সময় দলের লিড একশ রান ছাড়িয়ে ১০৬টিতে পৌঁছেছে।
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৬ উইকেট হারিয়ে ৭৯ রান। প্রথম ইনিংসের ২৭ রানের অমূল্য লিডসহ বর্তমানে দলীয় মোট লিড দাঁড়িয়েছে ১০৬ রান।
ম্যাচের শুরুতে দ্বিতীয় ইনিংসের সূচনাটা একেবারেই ভালো হয়নি বাংলাদেশের। ব্যক্তিগত রানের খাতা খোলার আগেই সফরকারী পেসার শামার জোসেফের লেগ স্টাম্পের ফুল লেন্থের বল ফ্লিক করতে গিয়ে গালিতে সহজ ক্যাচ দেন তরুণ ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। আগের ইনিংসে ৭ রান করা এই ওপেনার এবার নিজের নামের পাশে শূন্য রান যোগ করে দলীয় মাত্র ১ রানের মাথাতেই প্যাভিলিয়নে ফিরে যান।
এরপর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও সাদমান ইসলামের ব্যাটে ভর করে প্রাথমিক ধাক্কা সামলে বাংলাদেশের লিড ৫০ রান পার হয়। কিন্তু ইনিংসের ১১তম ওভারেই নতুন করে ধস নামে স্বাগতিক শিবিরে। মাত্র তিন বলের ব্যবধানে আউট হয়ে সাজঘরে ফেরেন আগের ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান সাদমান ইসলাম ও তাওহীদ হৃদয়। ৩০ বলে ১৩ রান করে রোস্টন চেজের বলে বোল্ড হন সাদমান। অন্যদিকে হৃদয় ক্রিজে নেমেই এক বল ডিফেন্ড করার পর ক্যারিবীয়দের ওপর চড়াও হওয়ার মানসিকতায় বড় শট খেলার চেষ্টা করেন; তবে ব্যাট-বলে ঠিকঠাক সংযোগ না হওয়ায় মিড-অনে সহজ ক্যাচ তুলে দেন শামার জোসেফের হাতে। আগের ইনিংসে ৪২ রান করলেও এবার তাঁর নামের পাশে যোগ হলো শূন্য রান।
এর আগে ফিল্ডিং করার সময় মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়ায় কনকাশন বদলি হিসেবে দ্বিতীয় ইনিংসে মুমিনুল হকের পরিবর্তে ব্যাটিংয়ে নামেন জাকের আলী অনিক। দলের খাতায় মাত্র ১ রান যোগ হতেই মিরপুরে হালকা বৃষ্টি নামে, যার ফলে বাধ্য হয়ে আগেভাগেই চা বিরতির ঘোষণা দেন আম্পায়াররা। বিরতির ঠিক আগমুহূর্তে মাত্র ৩৪ রান তুলতেই টপ অর্ডারের ৪ উইকেট হারিয়ে চরম বিপদে পড়ে বাংলাদেশ।
চা বিরতি থেকে ফিরে মাঠে নামার পরপরই নিজের উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসেন অভিজ্ঞ ব্যাটার লিটন কুমার দাস। জোমেল ওয়ারিকানের করা সোজা বলে এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়েন তিনি। মাত্র ১০ বল খেলে মোটে ৪ রান আসে এই উইকেটকিপার ব্যাটারের ব্যাট থেকে। ফলে মাত্র ৩৫ রানের ব্যবধানে ৫ উইকেট হারিয়ে দল সম্পূর্ণ ধুঁকতে শুরু করে। এই সংকটময় মুহূর্তে জাকের আলীর সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ। কিন্তু সেই জুটিও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; মিরাজকে ব্যক্তিগত ৯ রানে সাজঘরে ফেরান সেই ওয়ারিকানই।
এর আগে ম্যাচের শুরুতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল প্রথম ইনিংসে ৪ উইকেটে ১৩৪ রান থেকে তৃতীয় দিনের খেলা শুরু করে। সফরকারীদের হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন তেজনারায়ণ চন্দরপল; দীর্ঘ ১৮৪ বল মোকাবিলা করে ৬টি চার ও ১টি ছক্কার সাহায্যে ৫৬ রান করেন তিনি। পরে তাঁকে স্লিপে অধিনায়ক শান্তর ক্যাচ বানিয়ে ফেরান পেসার শরিফুল ইসলাম। এর আগে জাস্টিন গ্রিভসের সঙ্গে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ৬৫ রানের জুটি গড়ে ওঠে। গ্রিভসও জীবন পেয়েছিলেন, কারণ মুমিনুল হক তাঁর একটি সহজ ক্যাচ ফেলে দিয়েছিলেন। তবে পরে নাঈমের দুর্দান্ত অফসুইংয়ে এলবিডব্লিউ হয়ে ১০৩ বলে ২ চারে ৪৬ রান করে তাঁকে ফিরতে হয়।
মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর বাংলাদেশ অধিনায়ক বেশিরভাগ ওভারই দুই অফস্পিনারকে দিয়ে করান এবং তাঁরা বাকি ৪ উইকেট দ্রুত তুলে নেন। অভিষিক্ত ক্যারিবীয় অলরাউন্ডার জশুয়া বিশপ নেমেই তিনটি চার মারলেও ১৫ রানে মিরাজের স্টাম্পিংয়ের শিকার হন। এরপর শামার জোসেফ (৪), জোমেল ওয়ারিকান (০) ও জেইডেন সিলসকে (০) সাজঘরে ফেরান নাঈম হাসান। বাংলাদেশের হয়ে দ্রুততম ৫০ উইকেটের রেকর্ড গড়া নাঈম নেন ৪ উইকেট। এছাড়া মিরাজ ও তাইজুল ২টি করে এবং হাসান ও শরিফুল ১টি করে উইকেট শিকার করেন।