বারো বছরেরও বেশি সময় ধরে স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করেও একজন শিক্ষার্থী যদি কোনো একটি বিষয়ে নূন্যতম পাস নম্বর ৩৩ না তুলতে পারে, তবে সেই ব্যর্থতার দায় কার—শিক্ষার্থীর, নাকি তাকে এতদিন ধরে আলো দেখানো পুরো শিক্ষাব্যবস্থার? পরিবারের জমানো অর্থ, মা-বাবার হাড়ভাঙা শ্রম ও রাষ্ট্রের বিপুল বিনিয়োগের পরও যদি ন্যূনতম মৌলিক জ্ঞান অর্জিত না হয়, তবে দায়ভার শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দায়িত্ব এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
সম্প্রতি প্রকাশিত ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফল এই তিক্ত সত্যকে বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫২.১২ শতাংশে, যেখানে অকৃতকার্য হয়েছে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন শিক্ষার্থী। অথচ ২০২৪ সালেও পাসের হার ছিল ৭৭.৭৮ শতাংশ; অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ২৫.৬৬ শতাংশীয় পয়েন্ট। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ জন থেকে একলাফে কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৮৪ জনে। মূল্যায়ন কঠোর হওয়াকে এর কারণ হিসেবে বলা হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—কেবল কঠোর মূল্যায়নের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে অকৃতকার্য বানিয়েই কি শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন সম্ভব?
বিশেষ করে ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে সর্বমোট ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন অকৃতকার্য হয়েছে; যার মধ্যে ইংরেজিতে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। উচ্চশিক্ষা ও আধুনিক কর্মজীবনের জন্য অপরিহার্য এই দুই বিষয়ে মৌলিক জ্ঞান অর্জনে শিক্ষার্থীদের চরম ব্যর্থতা শ্রেণিকক্ষের পাঠদান, দক্ষ শিক্ষকসংকট ও ভঙ্গুর শিক্ষাবহির্ভূত পরিবেশকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তাছাড়া ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া ৪৬ হাজার ৮৬১ জনের মধ্যে প্রায় ৭২ শতাংশেরই ফেল করার তথ্য শিক্ষাব্যবস্থার গলদ স্পষ্ট করে। যেখানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বাজেট বেড়ে ১ লাখ ২২ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হচ্ছে, সেখানে পাস নম্বর না পাওয়ার নেপথ্য গলদ অনুসন্ধান করে রাষ্ট্র, শিক্ষা বোর্ড ও মন্ত্রণালয়ের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।