অন্ধকার
রাতের গর্ভে লুকিয়ে থাকা কিছু রহস্য কখনো কখনো আলোয় আসার আগেই এমন সব চাঞ্চল্যকর অধ্যায়ের
জন্ম দেয়, যা সাধারণ মানুষের
ভাবনারও অতীত। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ
সাউরির মর্মান্তিক ও রহস্যজনক মৃত্যুর
ঘটনাটি এখন এমনই এক জটিল ধোঁয়াশার
জাল বুনছে।
রাজধানীর
উত্তরার একটি অভিজাত বারে মদ্যপান, প্রেমিকার সঙ্গে গোপন সম্পর্কের টানাপোড়েন, উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় এবং সেখান থেকে গভীর রাতে টঙ্গীর অন্ধকার মাদক স্পটে হেরোইন খুঁজতে যাওয়ার রোমহর্ষক ও বিয়োগান্তক বিবরণ
ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে পুলিশের রিমান্ডে থাকা অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদে। তবে সমস্ত তথ্যের জট ছাড়িয়েও একটি
বড় প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা
দিয়েছে—মাতাল অবস্থায় পুলিশের ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় তুরাগ নদের পানিতে পড়ে কি করুণ পরিণতি
হয়েছিল মেধাবী এই সাবেক কর্মকর্তার,
নাকি এর পেছনে লুকিয়ে
রয়েছে অন্য কোনো গভীর ষড়যন্ত্র?
ঘটনার
সূত্রপাত গত ২৭ অক্টোবর
রাতে। বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরি তার দীর্ঘদিনের পরিচিত তরুণী জারিকা তাসনিম দিশা এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের সঙ্গে উত্তার ১৮ নম্বর সেক্টরের
নেস্ট বারে প্রবেশ করেন। তদন্ত কর্মকর্তাদের দেওয়া রিমান্ডের তথ্যানুযায়ী, ঘটনার ঠিক কিছুদিন আগে দিশা অন্য এক যুবকের বাসায়
গিয়ে মাদক সেবন এবং তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন বলে জানতে পারেন তাহসিফ। এই গোপন সত্যটি
জানার পর থেকেই তাহসিফের
মানসিক অবস্থা চরমভাবে ভেঙে পড়ে এবং প্রচণ্ড ক্ষোভ ও মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণায়
ভুগতেন তিনি। সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতেই সেদিন রাতে দিশাকে নিয়ে উত্তরার ওই বারে উপস্থিত
হন তাহসিফ।
বারে
প্রবেশ করেই তিনি ওয়েটারদের অত্যন্ত বিষণ্ন ও মন খারাপ
করা সংগীত বাজানোর নির্দেশ দেন। এরপর শুরু হয় টানা মদ্যপান।
রাত ১২টা পর্যন্ত তাহসিফ, দিশা এবং দীপ তিনজনই মদ পান করেন।
মদ্যপানের একপর্যায়ে তাহসিফ দিশাকে সরাসরি প্রশ্ন করেন কেন তিনি অন্য যুবকের সঙ্গে ইয়াবা সেবন ও রাত কাটিয়েছেন।
এ নিয়ে দুজনের মধ্যে শুরু হয় তীব্র কথা
কাটাকাটি ও বাকবিতণ্ডা। দিশার
ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তাহসিফ একপর্যায়ে ঘোষণা দেন, ‘তুমি তো ইয়াবা খেয়েছ,
আমি এর চেয়েও বড়
কিছু খাব। আমি হেরোইন খাব।’ এই চরম হিতাহিত
জ্ঞানশূন্য ঘোষণাটিই মূলত তাদের সেই রাতের ভয়ংকর পরিণতির দিকে ধাবিত করেছিল।
রাত
১২টার দিকে বার থেকে বেরিয়ে নিজ নিজ মোটরসাইকেলে চড়ে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে
দিশাকে তার বাসায় পৌঁছে দেন তাহসিফ। সঙ্গে ছিলেন বন্ধু দীপও। দিশাকে নিরাপদে নামিয়ে দেওয়ার পর তাহসিফ ও
দীপ বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সোজা
রওনা হন টঙ্গী বাজার
বস্তি সংলগ্ন মাঠের উদ্দেশে। তদন্তে জানা গেছে, এই বিপজ্জনক স্থানে
যাওয়ার সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণভাবে তাহসিফ নিজেই নিয়েছিলেন। মাঠের কাছাকাছি এসে তারা নিজেদের মোটরসাইকেলগুলো পার্ক করেন এবং হেঁটে মাঠের অন্ধকার গহ্বরে প্রবেশ করেন।
সে
সময় ওই মাঠে স্থানীয়
বহু মাদকসেবী ও মাদক কারবারির
আনাগোনা ছিল। মাঠে পা রেখেই তাহসিফ
সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উচ্চস্বরে চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘কার কার কাছে হেরোইন আছে, নিয়ে আসো। যত টাকা লাগে
আমি দেব।’ মুহূর্তের মধ্যে সেখানে উপস্থিত মাদক কারবারিদের একটি দল তাদের ঘিরে
ধরে। তাদের কাছ থেকে মাদক সংগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ সেবন করেন তাহসিফ। বারে অতিরিক্ত মদ্যপানের পর মাঠে গিয়ে
এই মারণাস্ত্র সদৃশ মাদক সেবন করায় তাহসিফ নিজের শরীরের ওপর সমস্ত নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেন।
ঠিক
সেই মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত হয় পুলিশের একটি
টহল দল। পুলিশের উপস্থিতি টের পাওয়া মাত্রই চারপাশের মাদক কারবারিরা যে যার মতো
অন্ধকার গলি ও ঝোপঝাড়ের আড়ালে
পালিয়ে যেতে শুরু করে। বন্ধু তাহসিফের সঙ্গে সে সময় দীপও
চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং জীবন বাঁচাতে দৌড়ে নদীর পাড়ের দিকে ছুটে যান। নিজেকে রক্ষা করতে তিনি নদীর ২৯ নম্বর পিলারের
পেছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়েন। তার অবুঝ ধারণা ছিল, পিলারের এই আড়ালে লুকিয়ে
থাকলে পুলিশ তাকে কোনোভাবেই খুঁজে পাবে না। আর ঠিক এই
ধস্তাধস্তির মাঝেই তাহসিফের কাছ থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান দীপ।
ঘটনার
বিবরণ দিয়ে দীপ জানান, দুই থেকে তিন মিনিট পিলারের পেছনে লুকিয়ে থাকার পর দুই পুলিশ
সদস্য এসে তাকে ঘিরে ধরেন এবং তার পরিচয় জানতে চান। পুলিশের ভয়ে দীপ তাৎক্ষণিকভাবে মিথ্যা বলে জানান যে তার বাসা
মোহাম্মদপুরে এবং তিনি একটি জরুরি কাজে সেখানে এসেছেন। তখন পুলিশ তাকে এত রাতে সেখানে
থাকার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি নিজেকে বিমানবাহিনীর ‘ক্যাপ্টেন তাহসিফের বন্ধু’ হিসেবে পরিচয় দেন। পুলিশ তাকে তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে দীপ বস্তির একটি সরু ও অন্ধকার রাস্তা
দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে এক অপরিচিত মাদকসেবীর
সাহায্য নিয়ে তিনি মূল সড়কে ফিরে আসেন এবং নিজের মোটরসাইকেলের কাছে পৌঁছান।
মূল
সড়কে ফিরে আসার পর দীপ একাধিকবার
তাহসিফের মোবাইল নম্বরে কল করার চেষ্টা
করেন, কিন্তু প্রতিবারই ফোন বন্ধ পান। এর আগে রাতে
তাহসিফের ফোন চার্জ দেওয়ার জন্য নিজের একটি পাওয়ার ব্যাংক তাহসিফকে দিয়েছিলেন দীপ। ফলে ফোন বন্ধ থাকায় তিনি ভেবেছিলেন চার্জ ফুরিয়ে যাওয়ার কারণেই এমনটি হয়েছে। তাছাড়া তাহসিফ সামরিক বাহিনীতে চাকরি করা অত্যন্ত স্মার্ট একজন মানুষ, তাই তিনি যেকোনো পরিস্থিতি নিজে থেকেই সামলে নিতে পারবেন—এমন অন্ধ ধারণাই পোষণ করেছিলেন দীপ। কোনো ধরনের বিপদের কথা বিন্দুমাত্র মাথায় না এনে দীপ
সোজা নিজের মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরে যান এবং গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। পুলিশের জেরার মুখে দীপ বারবার দাবি করেছেন যে, তিনি নিজ চোখে তাহসিফকে পানিতে পড়ে যেতে দেখেননি।
এদিকে
গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর
পেয়ে টঙ্গী নৌপুলিশ রাজাবাড়ী ঘাট সংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে একটি
অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার করে। পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে পরবর্তীতে মরদেহটি নিখোঁজ সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফের বলে শনাক্ত করা হয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ময়নাতদন্তের সময় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের জন্য তার পাকস্থলী, কিডনি, রক্ত এবং ভিসেরা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ডিএনএ পরীক্ষার নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে। ফরেনসিক চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, মরদেহটি প্রায় ১০ থেকে ১২
ঘণ্টা পানির নিচে submerged অবস্থায় ছিল, যা থেকে প্রাথমিকভাবে
ধারণা করা হচ্ছে এটি পানিতে ডুবেই মৃত্যু।
তবে
বিমানবাহিনীর একজন কর্মকর্তা হয়েও সাঁতার না জানার কথা
নয়, ফলে তিনি এমন কোনো শারীরিক ও মানসিক অচল
অবস্থায় পানিতে পড়েছিলেন কি না যেখানে
তার সাঁতার কাটার ন্যূনতম সক্ষমতাও কাজ করছিল না, তা খতিয়ে দেখা
হচ্ছে। মরদেহে বাহ্যিকভাবে কোনো স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন না থাকায় এটি
দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত কোনো ঘটনা, তা নিয়ে ধোঁয়াশা
কাটছেই না।
ঘটনার
রহস্য উদ্ঘাটনে মাঠে নেমেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)
ও নৌপুলিশ। গত ২৯ অক্টোবর
রাতে মোহাম্মদপুর থেকে দীপকে আটক করার পর তার দেওয়া
তথ্যের ভিত্তিতে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে আদালতে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে দীপকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একই সঙ্গে গত ১ নভেম্বর
কাফরুলের বাসা থেকে আটক করা হয় তরুণী জারিকা
তাসনিম দিশাকেও। নিহতের বাবা কে এম এনায়েতুল
করিম বাদী হয়ে উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
তিনি
অভিযোগ করেছেন, দীপের বক্তব্যে নানা অসঙ্গতি ও লুকোচুরি রয়েছে,
যা পুরো মৃত্যুকে আরও বেশি রহস্যজনক করে তুলেছে। সিসিটিভি ফুটেজ, কল রেকর্ড, মোবাইল
চ্যাট এবং রিমান্ডে আসামিদের দেওয়া বয়ান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করছে তদন্তকারী দল। ময়নাতদন্ত ও রাসায়নিক পরীক্ষার
চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে এলেই কেবল পরিষ্কার হবে এটি নিছক মাদকাসক্তির জেরে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে
রয়েছে কোনো অন্ধ অধ্যায়।